মঙ্গলবার । সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯ । । ১১:২৩ পিএম

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দাল

৪৭ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি, শহীদের নামে সড়ক চায় পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2019-04-28 17:22:07 BdST হালনাগাদ: 2019-07-29 22:23:41 BdST

Share on

সংবাদ সম্মেলনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দালের ছেলে সৈয়দ জামিল আব্দাল। ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সিলেটে পাকস্তানি হানাদার বাহিনীর বন্দিশালায় নিহত মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দালকে সম্প্রতি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তাঁর নামে কোন সড়ক বা স্থাপনার নামকরণ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।


বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল ২০১৯) সকালে সিলেট প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান সৈয়দ সিরাজুল আব্দালের বড় ছেলে মেজর ডা. সৈয়দ জামিল আব্দাল (অব:)।


সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জামিল আব্দাল বলেন, সিলেট ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন বধ্যভূমিতে বহু শহীদদের মত সৈয়দ সিরাজুল আব্দালকেও হত্যা করা হয়েছে। সেখানে তার সমাধিস্থল চিহ্নিত করতে সেনাপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দাল। ৪০ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। ছবি: সংগৃহীত

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দাল। ৪০ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিহত হন। ছবি: সংগৃহীত

এ বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি (২০১৯) প্রকাশিত এক গেজেটের মাধ্যমে প্রয়াত সৈয়দ সিরাজুল আব্দালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। গেজেটের প্রজ্ঞাপন নম্বর ৪৮.০০.০০০০.০০৪.৩৭.৯৯১.১৮(১)-৩৬৪।


সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ৪৭টি বছর আমার শহীদ বাবার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি ও কবরের সন্ধানে কাটিয়েছি। বাংলাদেশ সরকারসহ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে সকল তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করায় স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর পর আমার বাবাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ জন্য মহান আল্লাহ্র কাছে শোকরিয়া এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।’

স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর পর সৈয়দ সিরাজুল আব্দাল শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান ২০১৯ সালে।

স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর পর সৈয়দ সিরাজুল আব্দাল শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান ২০১৯ সালে।

জামিল আব্দাল বলেন, আমাদের বাবার কবরস্থান নির্দিষ্ট করে আমাদের মাঝে মধ্যে জিয়ারতের সুযোগ করে দেয়া হোক। আমরা ধারনা করি যে বর্তমান সিলেট ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন কোন পাহাড়ের কাছে কোন বধ্যভূমি আছে যেখানে বহু শহীদদের মত আমার বাবাকে হত্যা করা হয়। আমি একজন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন চিকিৎসক হিসেবে এই বিষয়ে মাননীয় সেনাপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।


তিনি বলেন, ঢাকায় যেভাবে বিভিন্ন রাস্তা ও প্রতিষ্ঠানের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সরকার দিয়েছে, সিলেটেও কোন একটি স্থানে আমরা আমাদের বাবার নামে দেখতে চাই এবং শহীদ পরিবারের অংশ হিসেবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতে চাই যে আমরা এক আত্মত্যাগী দেশপ্রেমিকের সন্তান যেন তা ইতিহাসে স্বাক্ষী হয়ে থাকে।

 

‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা তিন ভাইবোন অনেক ছোট ছিলাম। আমাদের মা অনেক কষ্টে আমাদের নিয়ে দিন যাপন করেন। ইচ্ছা সত্ত্বেও আমার বাবার মুক্তিযোদ্ধা এবং আমাদের শহীদ পরিবারের মর্যাদার জন্য সীমিত চেষ্টা করি। শেষ পর্যন্ত তাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তবে এখনও তার কবরটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’


তিনি আরও বলেন, ‘আমার মায়ের কাছ থেকে, মুক্তিযুদ্ধের ৩নং সেক্টরের সংশ্লিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে এবং বিভিন্ন পত্রিকা, বই এবং কিছু চিঠিপত্র থেকে যা জানতে পেরেছি, ‘মৌলভীবাজার থেকে ধরে আনার পর বাবাকে বর্তমান সিলেট ক্যাডেট কলেজ (তৎকালীন সিলেট রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল) এ বন্দি করে রাখা হয় এবং পাশের কক্ষে বন্দী ছিলেন আমিনুর রশিদ চৌধুরী।

দেওয়ান ফরিদ গাজীর লেখা  আমার দেখা স্বাধীনতা যুদ্ধ বইয়ে উঠে এসেছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল আব্দালের কথা

দেওয়ান ফরিদ গাজীর লেখা  'আমার দেখা স্বাধীনতা যুদ্ধ' বইয়ে উঠে এসেছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল আব্দালের কথা

তৎকালীন এমএনএ আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর লেখা 'আমার দেখা স্বাধীনতা যুদ্ধ' বইয়ে উঠে এসেছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দালের কথা, উল্লেখ করেন জামিল আব্দাল।


তিনি বলেন, প্রয়াত আমিনুর রশিদ চৌধুরী একজন শিল্প উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক ছিলেন। সিরাজুল আব্দালের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। তিনি 'যুগভেরী' নামে একটি বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা চালাতেন। পত্রিকাটির ১৯৭২ সালের ১ এপ্রিল সংখ্যায় তিনি 'অবিস্মরণীয় সেই হাসি' শিরোনামে সিরাজুল আব্দাল প্রসঙ্গে লিখেছিলেন।

সিলেট প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ। ছবি: সংগৃহীত

সিলেট প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ। ছবি: সংগৃহীত

জামিল আব্দালের বক্তব্য থেকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দাল সম্পর্কে জানা যায়-

সৈয়দ সিরাজুল আব্দালের জন্ম ১৯৩১ সালের ১৮ মে। হবিগঞ্জ জেলার আউশপাড়া গ্রামে। তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ১৯৫৭ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড পাড়ি জমান। সেখানে নর্দান আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে চা প্রযুক্তি (টি টেকনোলজি) বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। পড়াশুনা শেষ করে তিনি বেলফাস্টের খ্যাতনামা সিরোকো ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেয়েও দেশে ফিরে আসেন।

দেওয়ান ফরিদ গাজীর লেখা  আমার দেখা স্বাধীনতা যুদ্ধ বইয়ের ১২১ নম্বর পৃষ্ঠায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল আব্দাল প্রসঙ্গ লক্ষ্য করা যায়

দেওয়ান ফরিদ গাজীর লেখা 'আমার দেখা স্বাধীনতা যুদ্ধ' বইয়ের ১২১ নম্বর পৃষ্ঠায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল আব্দাল প্রসঙ্গ লক্ষ্য করা যায়

দেশে ফিরে ১৯৫৯ সালে তিনি ডানকান ব্রাদার্স লিমিটেডের হবিগঞ্জে অবস্থিত লাক্কাতুরাহ চা বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। কর্মস্থলে বাঙ্গালীদের প্রতি উর্দুভাষী কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অন্যায় প্রভাব ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদী ভূমিকা রাখেন। কর্মরত অবস্থায় তিনি ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।


১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে চা বাগানের শ্রমিকদের সংগঠিত করে সিলেটে হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ কারণে তিনি বন্দিও হন। পরে মুক্তিবাহিনী তাকে জেলখানা থেকে মুক্ত করে। পরবর্তীতে তিনি মৌলভিবাজারের পাল্লাকান্দিতে শ্বশুড় বাড়িতে গেলে সেখান থেকে রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে।

সংবাদ সম্মেলনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দালের পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

সংবাদ সম্মেলনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আব্দালের পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

জামিল আব্দাল বলেন, আমিনুর রশিদ চৌধুরীর ভাষ্য মতে ১৯শে মে ১৯৭১ সালে এই অকুতভয় বীর সৈনিককে চক্ষু বেঁধে এবং হাত পিছন থেকে বেঁধে নিয়ে যায় বন্দীখানা থেকে আর ফিরে আসেননি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেয়া এই বীর সৈনিক। এ থেকে বুঝা যায়, বর্তমান সিলেট ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ের বধ্যভূমিতে আরও শহীদদের মত তাঁকে হত্যা করা হয়। আজ পর্যন্ত আমরা তাঁর কবর কোথায় জানিনা।


সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন শহীদ সৈয়দ সিরাজুল আব্দালের স্ত্রী সৈয়দা সাকিনা আব্দাল, কন্যা সৈয়দা সায়মা আহমদ ও হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার সৈয়দ জাহেদুল ইসলাম জাহিদ।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত