বৃহস্পতিবার । অক্টোবর ২৪, ২০১৯ । । ০৮:৫৪ এএম

মিরপুরে একটি বাস টার্মিনাল অপরিহার্য: ওয়াজউদ্দিন

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2018-05-19 19:18:42 BdST হালনাগাদ: 2018-05-22 05:30:12 BdST

Share on

শেখ মোঃ ওয়াজউদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিস্থান পরিবহন লিমিটেড

‘সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে সব পরিবহন কোম্পানিতে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। কিন্তু চালকদের লাইসেন্স নবায়নে একটি নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে। যেসব চালকের পেশাদার মিডিয়াম ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে তারা সেটি নবায়ন করতে গেলে তাদেরকে পেশাদার হালকা ড্রাইভিং লাইসেন্স দিচ্ছে বিআরটিএ। এ লাইসেন্স বহনে কর্মরত অবস্থায় ট্রাফিক পুলিশের কাছে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন চালকরা। জরিমানা গুণতে হচ্ছে। বিআরটিএর এ আচরণ অযৌক্তিক ও হয়রানিমূলক।’


নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলছিলেন পরিস্থান পরিবহন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোঃ ওয়াজউদ্দিন। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে পরিবহন খাতের বিভিন্ন বিষয়সহ ওয়াজউদ্দিনের ব্যক্তি ও কর্মজীবনের নানা অনুষঙ্গ।


শেখ মোঃ ওয়াজউদ্দিনের জন্ম ১৯৬৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনের ধ-ব্লক এলাকায়। বাবা শেখ আবদুল রশীদ। মা সুবন নেসা। দুজনেই প্রয়াত। শেখ আবদুল রশীদ কর্মরত ছিলেন মিরপুর সিরামিকসে। পাশাপাশি পারিবারিক সূত্রে পাওয়া বিপুল ভূসম্পত্তি দেখাশোনা ও গৃহস্থালিও করতেন।

ওয়াজউদ্দিনের বক্তব্য
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে অপারেশন সার্চ লাইটে ওয়াজউদ্দিনের বাবা, বড় ভাইসহ মিরপুরের এই শেখ পরিবারের ১১ জন সদস্য প্রাণ হারান।


ওয়াজউদ্দিনের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার হাতেখড়ি শুরু হয় মিরপুর ১১ নম্বরের শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে।


বাবা, বড় ভাই হারিয়ে ওয়াজউদ্দিন হয়ে পড়েন অভিভাবকহীন। ফলে তার শৈশব, কৈশোর আর দশজনের মত স্বাভাবিক গতিতে এগোয়নি। মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হবার আগেই তার শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে। তার কাঁধে আসে সংসারের দায়িত্ব।

পরিস্থান পরিবহনের বাস। মিরপুর থেকে তোলা। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
১৯৭৪ সালের দিকে ওয়াজউদ্দিনের পরিবারের অনেক জমি সরকার অধিগ্রহণ করে। ওই জমি অধিগ্রহণের বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থে তারা পারিবারিকভাবেই যুক্ত হন আন্তঃজেলা ট্রাক পরিচালনার সঙ্গে। তাদের মালিকানায় ছিল ২০টি ট্রাক। সে সময় তিনিও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন পরিবহন খাতে। এভাবেই পারিবারিক সূত্রে পরিবহন খাতে শুরু হয় তার কর্মজীবন।


ওয়াজউদ্দিন বলেন, আমাদের অনেক জমি সরকার অধিগ্রহণ করে। একবার ৩ বিঘা জমির বিপরীতে সরকার ৮০০ টাকা দিয়েছিল।


ওয়াজউদ্দিনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের শুরু ১৯৯১ সালে। ওই বছর তিনি প্রথম বাসমালিক হন।

ওয়াজউদ্দিনের বক্তব্য
‘আধা বিঘা জমি বিক্রি করেছিলাম ২ লাখ ২০ হাজার টাকায়। ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় একটি বাস কিনি। মিরপুর থেকে ফার্মগেট হয়ে গুলিস্থানগামী ওই বাস চলত ২০ নম্বর রুটে। কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া সড়ক (বর্তমান রোকেয়া সরণি) তখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। সড়কের নির্মাণ কাজ চলছিল। এখনকার মত সে সময় পরিবহন কোম্পানি ছিলনা। সব বাস পরিচালিত হত পরিবহন সমিতির অধীনে।’


তখন যাতায়াত ভাড়া কত ছিল- জবাবে ওয়াজউদ্দিন বলেন, মিরপুর থেকে গুলিস্তানের ভাড়া পড়ত ২ টাকা ৫০ পয়সা। মিরপুর থেকে ফার্মগেটের ভাড়া ছিল ১ টাকা ৫০ পয়সা।


‘সে সময় বাসের জমা ছিল ১২শ’ থেকে ১৪শ’ টাকা। মিরপুর থেকে গুলিস্তান যেতে সময় লাগত ২০ থেকে ২৫ মিনিট। এর বেশি সময় কখনোই লাগত না। কোন সিটিং সার্ভিস ছিলনা। সড়ক দুর্ঘটনাও খুব একটা ঘটত না। পরিবহন খাতে এখনকার মত এত হইচই, অস্থিরতাও ছিলনা সে সময়।’

পরিস্থান পরিবহন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোঃ ওয়াজউদ্দিন। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
ওয়াজউদ্দিন ২০০৬ সালে যুক্ত হন পরিবহন কোম্পানি ঢাকা সিটি সুপার সার্ভিস লিমিটেডের সঙ্গে। এই পরিবহন কোম্পানিটি ৪০টি বাস নিয়ে শুরু করে তাদের গণপরিবহন ব্যবসা। তিনি এই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পাঁচ বছর। ব্যাংকঋণ নিয়ে তার মালিকানায় ছিল ৮টি বাস।


২০১৪ সালে তিনি ৪৩টি বাস নিয়ে পূর্বাচল সার্ভিস লিমিটেড নামে আরেকটি পরিবহন কোম্পানি চালু করেন। আব্দুল্লাহপুর থেকে মিরপুর হয়ে আজিমপুরগামী এই বাস সার্ভিস এক বছর পর বন্ধ হয়ে যায়। তিনি এই পরিবহন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার স্ত্রী ছিলেন পরিচালক।


২০১৬ সালের নভেম্বরে ওয়াজউদ্দিন ৫০টি বাস নিয়ে চালু করেন বসিলা থেকে মিরপুর হয়ে আব্দুল্লাহপুরগামী গণপরিবহন কোম্পানি পরিস্থান পরিবহন লিমিটেড। এই পরিবহন কোম্পানিতে ১২ জন পরিচালক আছেন। তার স্ত্রী শেখ শিরিন শান্তি এই কোম্পানির চেয়ারপারসন।

ওয়াজউদ্দিনের বক্তব্য
পরিস্থান পরিবহনের জনবল প্রসঙ্গে ওয়াজউদ্দিন বলেন, আমাদের পরিস্থান পরিবহনে ১২০ জন চালক, ১২০ জন সহযোগী, ২৫ জন সুপারভাইজার আছেন।


সব চালক ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রত্যেক চালকের লাইসেন্স আছে। লাইসেন্স ছাড়া আমরা কোন চালক রাখিনা।


ওয়াজউদ্দিন ১৯৮৭ সালে শেখ শিরিন শান্তিকে বিয়ে করেন। শিরিন শান্তি ঢাকা মহানগর উত্তররে দুই নম্বর ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্য।

বন্ধ হয়ে যাওয়া পূর্বাচল সার্ভিস লিমিটেড। ছবি: সংগৃহীত
ওয়াজউদ্দিন-শিরিন দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে। প্রথম সন্তান শেখ সাগর, বারবিকান কলেজ লন্ডন থেকে সিএ পড়েছেন। বর্তমানে তিনি ইতালিতে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় সম্পৃক্ত আছেন। দ্বিতীয় সন্তান শেখ শোভা আশা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন। ছোট সন্তান শেখ নাজমুল সৈকত মিরপুর বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার (২০১৮) মাধ্যমিক পাশ করেছে।


পরিবহন খাতে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি নৃশংস দুর্ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ আলোচিত নির্মম সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারান ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী (বিপণন) নাজিম উদ্দিন।


চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতার কথা স্বীকার করে ওয়াজউদ্দিন বলেন, বেশিরভাগ চালকরা ট্র্যাফিক আইন মানতে চায় না। এমনকি অনেক চালক সেগুলো ভাল করে বোঝেও না। রাস্তায় এখন যে পরিমাণ ট্র্যাফিক জ্যাম হয় তাতে যাত্রীরা যেমন বিরক্ত, তেমনই চালকরাও। এর ফলে তাদের মধ্যে একটা তাড়াহুড়ার প্রবণতা কাজ করে। বেপরোয়া প্রতিযোগিতার ইন্ধন কিন্তু তারা সে কারণেই পায়। বিভিন্ন মার্কেট, অফিসের সামনের রাস্তাগুলোতে গাড়ির অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এতেও দুর্ঘটনা ঘটছে।


তিনি আরও বলেন, একই রাস্তায় রিকশা, হিউম্যান হলার, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা- সবই চলছে। ধীরগতি, মধ্যমগতি, উচ্চগতি যানবাহন একই রাস্তায় চললে গতির সামঞ্জস্য বজায় রাখাও একটি চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। গতি অনুযায়ী যানবাহনের চলাচল পৃথক করা ও তা পূর্ণাঙ্গ তদারকি করা উচিত।


‘সব মেইন রোড থেকে রিকশা তুলে দেয়া উচিত।’


গণপরিবহনে পরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে ওয়াজউদ্দিন বলেন, এসব ঘটনা একেবারেই অনাকাঙ্খিত। এসব অপকর্মে অপরাধীদের কঠিন সাজার আওতায় আনা গেলে এ ধরণের ঘটনা ঘটবে না।

মিরপুরে পরিস্থান পরিবহনের কার্যালয়ে ওয়াজউদ্দিন। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
‘এটি একটি সাময়িক সমস্যা’


বাসে নারীদের যৌন হয়রানি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না, মনে করেন তিনি।


মিরপুরের কালশি, সেনানিবাস উড়াল সেতু হয়ে আব্দুল্লাহপুর ও বনানী-গুলশানমুখী ১৪টি পরিবহন কোম্পানির প্রায় সাড়ে ৮৫০টি বাস বর্তমানে চলাচল করছে। সিটিং সার্ভিসের নামে এসব বাস দাঁড়ানো যাত্রীবোঝাই করে চলাচল করে সবসময়। নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়াও এসব বাস যাত্রী তোলার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। আর এ নিয়ে যাত্রী-সহযোগী-চালকদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা, এমনকি হাতাহাতিতে পর্যন্ত গড়ায়। এমন চিত্র এখন নিত্য দিনের।


বাসগুলো কেন সিটিং সার্ভিস দিতে পারছেনা- উত্তরে ওয়াজউদ্দিন বলেন, রাস্তায় তীব্র যানজটের কারণে বাসগুলো পর্যাপ্ত ট্রিপ দিতে পারছেনা। এতে গন্তব্যমুখী অপেক্ষমান যাত্রীদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে, আমরা তাদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছি। বাসে একজন সহযোগীর পক্ষে কর্মস্থলমুখী যাত্রীদের বাসে উঠতে বাধা দেয়া মোটেও সহজ ব্যাপার না। আবার পর্যাপ্ত ট্রিপের অভাবে ব্যবসায়িকভাবে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। যাত্রী চাহিদা মেটাতে ও ব্যবসায়িক ক্ষতি এড়াতে পরিবহন কোম্পানিগুলো সিটিং সার্ভিস দিতে পারছেনা।

ওয়াজউদ্দিনের বক্তব্য
আপনারা ৫০টি বাস নিয়ে পরিস্থান পরিবহন চালু করলেন। বাসগুলো কি রাস্তায় রাখার পরিকল্পনা ছিল আপনাদের- জানতে চাইলে ওয়াজউদ্দিন বলেন, এটি যে শুধু আমরাই করছি তা নয়। সব কোম্পানির বাস রাতে রাস্তার পাশে পার্কিং করছে। এছাড়া আমাদের বিকল্প কোন পথ নেই।


তিনি বলেন, মিরপুরে গণপরিবহনের আধিক্য ৮০’র দশক থেকেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিরপুরে গণপরিবহনের চাপ বেড়েছে অনেক। মিরপুরে একটি বাস টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা আজকের না। আমরা বাসগুলো রাস্তার পাশে, এলাকার অলিগলিতে পার্ক করে সাধারণ মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি করতে চাইনা। এ নিয়ে বহু বছর ধরেই মিরপুরের পরিবহন ব্যবসায়িরা চেষ্টা করেছেন। মিরপুরে সরকারের অনেক পতিত জমি আছে। সরকার আন্তরিক হলে এ সমস্যার সমাধান বেশ দ্রুতই সম্ভব। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক মিরপুরে টার্মিনাল করার একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন।


পরিবহন ব্যবসা নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ওয়াজউদ্দিন বলেন, আগামীতে পরিস্থান পরিবহনে আমরা ধাপে ধাপে আরও বাস যুক্ত করবো। বসিলার অদূরে ঘাটারচর এলাকায় যাত্রী চাহিদা রয়েছে। এ স্থানকে কেন্দ্র করে আমাদের বাস বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ওয়াজউদ্দিনের সঙ্গে তার স্ত্রী শিরিন শান্তি। ছবি: সংগৃহীত
আরেক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের চাহিদা আছে। তবে আপাতত তা যুক্ত করার পরিকল্পনা নেই। মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের কারণে মিরপুরে এখন তীব্র যানজট হয়।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত