বৃহস্পতিবার । অক্টোবর ২৪, ২০১৯ । । ০৮:৫৯ এএম

দেশেই তৈরি হচ্ছে বিনোদন পার্ক রাইড: মামুন পারভেজ

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2018-06-01 11:44:44 BdST হালনাগাদ: 2018-07-04 06:46:55 BdST

Share on

এস এম মামুন পারভেজ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড (শ্যামলী)


বিনোদন পার্কগুলোর ৫০-৭০ ভাগ রাইডস দেশেই তৈরি
আমদানিকৃত রাইডগুলো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা সম্ভব
বিনোদন পার্ক রাইডস তৈরি শিল্পে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা


‘দেশের বিনোদন পার্কগুলোতে বেশিরভাগ রাইড দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে। এসব রাইড টেকসই ও নিরাপদ এবং গুণগত মানের দিক থেকেও সন্তোষজনক। এমনকি বিনোদন পার্কের জন্য আমদানিকৃত রাইডগুলোও দেশেই তৈরি করা সম্ভব। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এসব রাইড তৈরি করছি। এমন অনেক অত্যাধুনিক রাইড তৈরি করার সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে।’


নতুনআলো টয়েন্টিফোর ডটকমের একান্ত সাক্ষাৎকারে দেশের বিনোদন পার্কের রাইড তৈরির সক্ষমতা প্রসঙ্গে এসব কথা বলেন ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ডের (শ্যামলী শিশুমেলা) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডোমেস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি সার্ভিসেস (ডেটস) এর স্বত্বাধিকারী এস এম মামুন পারভেজ।


সাক্ষাৎকারে তার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে বিনোদন পার্ক শিল্পের নানা অনুষঙ্গ।


দেশে জনসংখ্যা ও চাহিদার তুলনায় বিনোদন পার্কের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বিশেষত প্রায় দেড় কোটি মানুষের নগরী ঢাকায় ঘরোয়া পরিসরের বাইরে নাগরিকদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা খুব নাজুক।


ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে রাইডসম্বলিত মূলধারার বিনোদন পার্ক ৪টি- ওয়ান্ডারল্যান্ড (সায়েদাবাদ), শহীদ জিয়া শিশু পার্ক (শাহবাগ), ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড(শ্যামলী) ও ফ্যান্টাসি আইল্যান্ড (উত্তরা)। এর মধ্যে শিশু পার্ক ছাড়া বাকি তিনটিই গড়ে উঠেছে বেসরকারি উদ্যোগে।


আগারগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে বিমান বাহিনী জাদুঘরও বিনোদন পার্কের সুবিধা দিচ্ছে।


গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের ও ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগে দেশে গড়ে উঠেছে বিনোদন পার্ক রাইড তৈরি শিল্প। এতে সাশ্রয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান।

বিনোদন পার্কের এমন বড় রাইড তৈরি হয় দেশীয় প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায়। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
কনকর্ড গ্রুপের আধুনিক বিনোদন পার্কগুলো ছাড়া দেশে চলমান বিনোদন পার্কগুলোতে দেশীয় প্রযুক্তি ও সক্ষমতার সমন্বয়ে তৈরি রাইডের ব্যবহারই বেশি বলে উল্লেখ করে মামুন পারভেজ।


‘দেশে যেসব বিনোদন পার্ক গড়ে উঠেছে তার নকশা, অবকাঠামো, স্থাপত্যশৈলী দেশের স্থপতি, প্রকউশলীসহ এই খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই করেছেন। শুধু তাই নয়, বিনোদন পার্কের বেশিরভাগ রাইড তৈরি হয়েছে দেশেই।’


তিনি বলেন, সাধারণত কিডি (বাচ্চাদের) রাইডগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা হয়। মেরি-গো-রাউন্ড, ওয়ান্ডার হুইল, ট্রেনের মত বড় রাইডগুলো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়।’


বিনোদন পার্কের রাইডগুলো বিদেশ থেকে আমদানি না করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তৈরি করা হলে আমদানিকৃত খরচের এক তৃতীয়াংশ খরচেই রাইডগুলো তৈরি করা সম্ভব, জানান মামুন পারভেজ।


‘এতে যেমন দেশের টাকা বাইরে যাবেনা, তেমনি অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও হবে। এতে আরেকটি বড় সুবিধা হল- এসব রাইডের মেইন্টেন্যান্স খরচও অনেক কমে আসবে।’

সাক্ষাৎকারে বিনোদন পার্ক রাইড তৈরি শিল্প নিয়ে কথা বলেন এস এম মামুন পারভেজ। সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন সৈনূই জুয়েল। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকৌশল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডেটস যাত্রা শুরু করে ১৯৯০ সালে। বিনোদন পার্কের রাইড তৈরি ছাড়াও অনেক সরকারি প্রকল্প নির্মাণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও রয়েছে মামুন পারভেজের এই প্রতিষ্ঠানের।


তিনি বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা একটি বিনোদন পার্কের সব কাজ দেশেই সারতে পারি। সেই সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। তবে অনেক রাইডে জটিল ও আধুনিক ম্যাকানিজম রয়েছে- সেগুলোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেগুলোর সংযোজন (এসেম্বল), মেরামত (সার্ভিসিং) এমনকি রূপান্তরও (মডিফিকেশন) অনায়াসেই দেশে করা যায়।


বিনোদন পার্ক রাইডস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডেটস প্রায় তিন দশক ধরে দেশের বিভিন্ন বিনোদন পার্ক তৈরিতে সহায়তা দিয়ে আসছে। তৈরি করছে আধুনিক ও টেকসই রাইডস।


ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ডের (শিশুমেলা) ৫০ ভাগ রাইডস বিদেশ থেকে আমদানি করা, ও বাকি ৫০ ভাগ রাইড তার তত্ত্বাবধানেই তৈরি হয়েছে।


দেশে কতগুলো প্রতিষ্ঠান বিনোদন পার্কের রাইড তৈরি করছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে মামুন পারভেজ নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান আর বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মানুষ বিনোদন পার্কের রাইড তৈরি করছে।


তিনি বলেন, বিনোদন পার্ক রাইড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন কোন দৃশ্যমান অবকাঠামো নেই। সাধারণত প্রত্যেক বিনোদন পার্কের নিজস্ব রাইড মেরামত, তৈরি, মডিফিকেশনের একটি কারখানার ব্যবস্থা থাকে। যেসব পার্কের অভিজ্ঞতা বেশি, জনবল ও আধুনিক আর আকর্ষণীয় রাইড তৈরির সক্ষমতা আছে, তাদেরকে দিয়ে নতুন পার্ক উদ্যোক্তারা রাইড তৈরি করিয়ে নেয়।


বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে যারা বিনোদন পার্কের রাইড তৈরির কাজ করছেন, তাদের অনেকেই আমাদের শিশুমেলায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ডের কার্যালয়ে এস এম মামুন পারভেজ। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
দেশে বিনোদন পার্কের রাইড তৈরির পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান ওয়ান্ডারল্যান্ড গ্রুপ ও ডেটস। এ দুটি প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে সর্বপ্রথম বিনোদন পার্কের রাইড তৈরি শুরু করে।


রাহা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ও ইউটোপিয়া নামে দুটি প্রতিষ্ঠান বিনোদন পার্ক রাইড তৈরি করছে- প্রসঙ্গে মামুন পারভেজ বলেন, এ দুটি প্রতিষ্ঠান যারা চালাচ্ছেন, তারা শিশুমেলায় আমার তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন কর্মরত থেকে রাইড তৈরির কলাকৌশল শিখেছে।


নব্বই দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিনোদন পার্ক খাতে বিনিয়োগের একটি সম্ভাব্য আর্থিক চিত্র তুলে ধরে মামুন পারভেজ বলেন, ১৯৯০-২০০০ সালের মধ্যে এই খাতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ২০০০-২০০৫ সালের মধ্যে এই খাতে আরও বিনিয়োগ হয়েছে ১০০ কোটি টাকা এবং ২০০৫- ২০১৭ সালের মধ্যে আরও ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে এসব বিনিয়োগের প্রায় ৭০ ভাগ খরচ হয়েছে পার্কের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে। বাকি ৩০ ভাগ খরচ হয়েছে রাইড আমদানি ও তৈরিতে।


মামুন পারভেজ বলেন, আমাদের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫টি বিনোদন পার্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এখনও চলমান অবস্থায় আছে ১০টি পার্ক। বাকিগুলো বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে।


মেরি-গো-রাউন্ড, ওয়ান্ডার হুইল, ট্রেইন, সুপার সুইং চেয়ার, প্যারাট্রুপার, ফ্লাওয়ার কাপ, টি কাপ, টুইস্টার, কিডি রাইড শতাধিক প্রকারের রাইড তৈরি করেছেন মামুন পারভেজ।


রাইডে যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত কারণে বা রাইড ভেঙ্গে কোন প্রকার দুর্ঘটনা কখনো ঘটেছে কিনা- উত্তরে মামুন পারভেজ বলেন, ডেটসের তৈরি কোন রাইডে চড়ে যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত কারণে কোন দুর্ঘটনা কখনোই ঘটেনি। আর রাইড ভেঙ্গে পড়ারও কোন নজির নেই।


২০১০ সালের আগে ওয়ান্ডারল্যান্ড গ্রুপের ঢাকায় তিনটি ও চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া, ফরিদপুরে একটি করে বিনোদন পার্ক তৈরি করে। এর মধ্যে ঢাকার গুলশানের ওয়ান্ডারল্যান্ড ২০১২ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড (সাবেক শ্যামলী শিশুমেলা)। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
মামুন পারভেজ বলেন, ওই পাঁচটি বিনোদন পার্ক ছাড়াও আমাদের তৈরি পার্ক রয়েছে- নারায়ণগঞ্জে অ্যাডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড, জামালপুরে লুইস ভিলেজ, গোপালগঞ্জে শেখ রাসেল পার্ক, নওগাঁয় আবদুল জলিল শিশু পার্ক, রাজশাহীতে শহীদ জিয়া শিশু পার্ক, কিশোরগঞ্জে কিশোরগঞ্জ পৌর পার্ক।


দেশের প্রথিতযশা বিনোদন পার্ক ব্যক্তিত্ব এস এম মামুন পারভেজের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি। মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে। বাবা মোঃ মহিউদ্দিন পেশায় ব্যবসায়ি ছিলেন। মা লুৎফা বেগম ছিলেন গৃহিণী। তার স্ত্রীর নাম শামিমা পারভেজ। তাদের এক মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়ে সুষমা পারভেজের পড়াশোনা, বসবাস যুক্তরাষ্ট্রে। ছেলে হাসান পারভেজ, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।


মামুন পারভেজের কর্মজীবনের সূত্রপাত পারিবারিক ব্যবসায়। নিজের ব্যবসার শুরু ১৯৭৫ সালে- ঘড়ি আর কাপড়ের। করেছেন চশমার ব্যবসাও।


তিনি ১৯৮৪ সালে আসেন খাবারের ব্যবসায়- ফাস্টফুড, দুগ্ধজাত খাবার ও জুস। ছয় বছর করেছেন এই ব্যবসা।


বাংলাদেশে সর্বপ্রথম পিৎজা প্রচলন করেন মামুন পারভেজ। শুধু তাই নয় তিনি ঢাকায় ফাস্টফুডেরও প্রচলন করেন।


তিনি ১৯৮৮ সালে তিনি লায়ন্স ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে তিনি লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের ডিস্ট্রিক্ট-৩১৫বি২’র উপদেষ্টা।


মামুন পারভেজ ১৯৯০ সালে শ্যামলীতে অবস্থিত শিশুমেলার (বর্তমান ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড) সঙ্গে যুক্ত হন।


বিনোদন পার্ক নির্মাণ পরামর্শক ও প্রস্তুতকারক মামুন পারভেজ দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নির্মিত অসংখ্য বিনোদন পার্ক নির্মাণে সম্পৃক্ত থেকেছেন। নির্মিতব্য বিনোদন পার্কেগুলোর পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত