বৃহস্পতিবার । অক্টোবর ২৪, ২০১৯ । । ০৮:৫৮ এএম

ব্যাংকঋণ ছাড়া সফল উদ্যোক্তা হবার সুযোগ নেই: সংগীতা আহমেদ

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2018-09-20 12:03:03 BdST হালনাগাদ: 2018-10-04 12:31:46 BdST

Share on

সংগীতা আহমেদ। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

‘সারা দেশে শহর, নগর, মফস্বল এমনকি গ্রামেও তৃণমূল পর্যায়ে অসংখ্য নারী ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন। আর্থিক খাতে তাদেরও অবদান আছে, কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে তা যোগ হচ্ছেনা। কারণ এ বিষয়ের কোন সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তাদের লেনদেনের হিসাবও নেই। সেসব তৃণমূল নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনা গেলে দেশের আর্থিক খাতের পরিসর বৃদ্ধি পেত, আর তাদের অবদানেরও একটি হিসেব করা যেত।’


নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকমের একান্ত সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিডাব্লিউসিসিআই) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি সংগীতা আহমেদ। তিনি বাংলাদেশ মহিলা সমিতিরও সহ-সভাপতি। দায়িত্ব পালন করছেন অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক পদে।

বাংলাদেশ উইমেন চেম্বারের (বিডাব্লিউসিসিআই) কর্মসূচিতে সেলিমা আহমাদের সঙ্গে সংগীতা আহমেদ ও অন্যান্য নারী উদ্যোক্তারা
তিনি বলেন, ২০০৪ সালে বিডাব্লিউসিসিআই’র সদস্য ছিল ১৪ জন। আর এখন এর সদস্য ১৫ হাজারের বেশি। আমরা এসব সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যাংকবান্ধব করেছি, যাতে তারা সহজে ব্যাংকঋণ পেতে পারে, তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিডব্লিউসিসিআই শুরু থেকেই ইতিবাচক ভুমিকা রাখছে।


এক প্রশ্নের উত্তরে সংগীতা বলেন, সব ব্যাংকেই নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ প্রদান কর্মসূচি আছে। কিন্তু ব্যাংকঋণ পেতে হলে ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর সনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরসহ ব্যবসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে থাকতে হয় ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন। এসব বিষয়ে সাধারণ নারী উদ্যোক্তারা ঝামেলায় পড়েন। ফলে ঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংকঋণ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় সাফল্য পাওয়া কঠিন।

সফল নারী উদ্যোক্তা ও নারী উন্নয়ন নেত্রী সংগীতা আহমেদ
‘ব্যবসার পরিসর বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ফলে উদ্যোক্তাদের অবশ্যই ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হবে। ব্যাংক ঋণ ছাড়া সফল উদ্যোক্তা হবার সুযোগ নেই।’


সংগীতা বলেন, নারী উদ্যোক্তারা যদি নিজ নিজ অঞ্চলের বিভিন্ন ব্যবসায়ি সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাহলে তাদের অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। সম্মিলিত উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকলে অনেক জটিল ও কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়।


বিডব্লিউসিসিআই’র দেশব্যাপী কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিডব্লিউসিসিআই এখন সাতটি বিভাগে সক্রিয়। চারটি বিভাগে বিডব্লিউসিসিআইয়ের নিজস্ব আঞ্চলিক কার্যালয় আছে। তিনটি বিভাগে ঘরোয়া পরিসরে চলছে কার্যক্রম। বিভাগীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের বিডব্লিউসিসিআইয়ের সদস্যভুক্ত করতে কাজ করছি আমরা।

বিটিভির রাত ১০টার ইংরেজি সংবাদের নিয়মিত পাঠিকা সংগীতা আহমেদ
‘বিডব্লিউসিসিআই এ পর্যন্ত ২০ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাদেরকে সঠিক উপায়ে ব্যবসা স্থাপন (সেটআপ) ও ব্যাংকবান্ধব করার জন্য।’


সম্প্রতি বিডব্লিউসিসিআই থেকে ১ হাজার নারীকে রূপচর্চা (বিউটিফিকেশন), খাবার ও পানীয় (ফুড অ্যান্ড বেভারেজ) ও ফ্যাশন ডিজাইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে যারা ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে।


সংগীতা আহমেদ বলেন, অচিরেই বিডব্লিউসিসিআই’র সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির ফলে বিডব্লিউসিসিআই’র সদস্যরা সহজে ব্যাংক ঋণ পাবে। যেহেতু সারা দেশে অগ্রণী ব্যাংকের ৯৭০টি শাখা রয়েছে তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা বিডব্লিউসিসিআই’র সদস্যরা এই ঋণ সুবিধা পাবেন।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার বিডাব্লিউসিসিআইয়ের প্রতিবাদী কর্মসূচিতে সংগীতা আহমেদ, সংগীতা খানসহ নারী উদ্যোক্তারা
তিনি বলেন, আমরা ব্যবসার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়েও কাজ করছি। প্রথাগত ব্যবসা ধীরে ধীরে খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। পর্যটন, প্রযুক্তিমুখী (যেমন: গ্রাফিক ডিজাইন ইত্যাদি) ব্যবসায় নারীদের যুক্ত করতে আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।


ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীর অংশগ্রহণ পূর্বের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন সংগীতা আহমেদ।


তিনি বলেন, তবুও এই অংশগ্রহণ আশানুরূপ নয়। এর পেছনে পারিবারিক, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আছে। তাছাড়া দক্ষতার অভাব, মূলধনের অভাব এবং নিরাপত্তার অভাবসহ নানা বিষয় রয়েছে। সক্ষমতা অনুযায়ী উদ্যোক্তা বাড়লে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে। এক্ষেত্রে নারীদের আরও আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন সংগীতা আহমেদ
সংগীতা আহমেদ বলেন, বেশিরভাগ নারীরা ফ্যাশন হাউজ কিংবা বিউটি পার্লার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সময় বদলেছে। ক্রেতা বা গ্রাহকদের রুচি, পছন্দে পরিবর্তন এসেছে। ব্যবসায় বেড়েছে প্রতিযোগিতা। অল্প পুঁজিতে ফ্যাশন হাউজ, বিউটি পার্লার ব্যবসা শুরু করার সুযোগ এখন কমে এসেছে। এসব ব্যবসায় পেশাদারিত্ব, বিশেষত্ব আর নতুনত্ব নিশ্চিত না করতে পারলে সফল হওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, গুণগত মানের পণ্য বা সেবা, সময়োপযোগী বিপণন ইত্যাদি।


‘বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক সুযোগ বেড়েছে। তবে এসব সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন উদ্যোগী মানসিকতা- আর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, প্রশিক্ষণ।


নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী অবস্থা প্রসঙ্গেও কথা বলেন সংগীতা আহমেদ।

বিডাব্লিউসিসিআই এর একটি অনুষ্ঠানে সেলিমা আহমাদসহ অতিথিদের সঙ্গে সংগীতা আহমেদ
তিনি জানান, নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের মাঠে নেমে আসা একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এমন একটি আন্দোলন যৌক্তিক তো বটেই, বরং এটি ছিল সময় ও পরিস্থিতির দাবি।


তিনি বলেন, এ আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল। সড়কে যারা নৈরাজ্য করছে, সাধারণ মানুষ তাদের কাছে জিম্মি হয়ে নিত্যদিন যাতায়াত করছে। ছাত্রদের এ আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।


তিনি আরও যুক্ত করেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করে ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়েছেন। কিছু পদক্ষেপ দ্রুত নেয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি দাবিগুলো দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়িত হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন। আমরাও তা বিশ্বাস করি। সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি পথচারী হিসেবে আমাদেরও আইন ও নিয়ম মেনে পথ চলতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস করতে হবে। অন্যথায় এমন একটি আন্দোলনের ফল খুব বেশি কার্যকর হবে না।

বিডাব্লিউসিসিআই এর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি সংগীতা আহমেদ। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
বাংলাদেশ মহিলা সমিতির কার্যক্রম প্রসঙ্গে সংগীতা আহমেদ বলেন, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, বিনামূল্যে স্কুল কার্যক্রম, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, সালিশ কার্যক্রমসহ মহিলা সমিতির অনেক সফল কার্যক্রম রয়েছে। তাদের প্রকল্পও অনেক। বিপুল সংখ্যক নারীকে তারা প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের আওতায় এনেছে। ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়ছে। এখানকার বেশিরভাগ নারীনেত্রী খুবই অভিজ্ঞ ও বয়জ্যেষ্ঠ। তারা সংগঠনের কার্যক্রমকে আরেকটু আধুনিকায়ন করতে পারেন একটি ওয়েবসাইট তৈরির মাধ্যমে। ওয়েবসাইটে সংগঠনের কার্যক্রম ও তথ্যাদি সন্নিবিষ্ট করা গেলে মানুষ আরও সহজে জানতে ও যুক্ত হতে পারত এ সংগঠনের সঙ্গে।


সংগীতা আহমেদের মা রেনু আহমেদ ছিলেন মহিলা সমিতির একজন নারীনেত্রী। রেনু আহমেদ স্মরণে মহিলা সমিতি ২০০৪ সাল থেকে ‘রেনু আহমেদ মেমোরিয়াল ট্রেনিং প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প চালু রেখেছে।

বিল্ড বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে সংগীতা আহমেদ, সঙ্গে অন্যান্য অতিথিরা
আলোকিত ও সফল নারী উদ্যোক্তা ও নারী উন্নয়ন নেত্রী সংগীতা আহমেদ বনানীর জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ টাইম আউটের স্বত্বাধিকারী (ব্যবস্থাপনা অংশীদার)। এই রেস্তোরাঁর একটি শাখা রয়েছে গুলশান ১ নম্বরে। তিনি যুক্ত আছেন গুলশানের অভিজাত বিউটি স্যালন গালা মেকওভার স্টুডিও অ্যান্ড স্যালনের অংশীদার হিসেবেও।

 

আরও পড়ুন

ফ্যাশন হাউজে শুরু, রেস্তোরাঁয় সফল 

অনন্য দিনের সংগীতাদ্বয়



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত