মঙ্গলবার । মে ১৮, ২০২১ । । ০৪:৩৩ এএম

ভাষানটেক থানা

ভাষানটেকে মাদক স্পট, কিশোর গ্যাং নেই: ওসি দেলোয়ার

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2021-03-22 04:42:46 BdST হালনাগাদ: 2021-03-24 19:09:11 BdST

Share on

ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দেলোয়ার হোসেন। ছবি: নতুন আলো

মো. দেলোয়ার হোসেন। ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি এই থানায় যোগ দিয়েছেন ২৭ ডিসেম্বর ২০২০। পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে প্রথমবার তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্ব পেলেন।


ভাষানটেক থানা এলাকার নানা বিষয় নিয়ে নতুন আলো টয়েন্টিফোর ডটকমের একান্ত সাক্ষাৎকারে মো. দেলোয়ার হোসেন কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈনূই জুয়েল।


রাজধানীতে ভাষানটেক থানার যাত্রা শুরু হয় ১৩ এপ্রিল ২০১২। প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ভাষানটেক থানার আওতায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ অধিবাসী রয়েছে।


মাসে ২০টি মাদক, ৮টি প্রেম-বিয়ে সংক্রান্ত মামলা
ভাষানটেক থানা এলাকার অপরাধ ও অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ থানার বাসিন্দাদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। তাদের জীবনযাপনও নিম্নমানের। এ থানায় আমি এসেছি দু মাসের কিছু বেশি। এখানে মূলত দুটি অপরাধ বেশি- মাদক ও প্রেম-ঘটিত অপরাধ। মাসে ২০টির মত মাদক মামলা আর ৭-৮টির মত প্রেম ও বিয়ে সংক্রান্ত প্রতারণা ও নারী নির্যাতন মামলা হয়। এর বাইরে তেমন কোন গুরুতর অভিযোগ কিংবা অপরাধ খুব একটা দেখা যায় না।

ভাষানটেক থানা
থানার জনবল সংকট বা অন্যান্য সংকট আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার থানা এলাকার আয়তন অনুযায়ী থানার জনবল সংকট নেই। তবে থানার পরিবহন যানের সংকট আছে। এটি দূর করা গেলে জনসাধারণের সেবায় আরও গতি বাড়ানো সম্ভব।


কিশোর অপরাধী আছে, কিশোর গ্যাং নেই
দলবদ্ধ কিশোর অপরাধ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওসি দেলোয়ার নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন এ থানায় বিচ্ছিন্নভাবে কিশোর অপরাধী আছে তবে কিশোর গ্যাং নেই। আমরা এলাকায় মাইকিং করে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি, অভিভাবকদের সচেতন করছি। কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত সম্প্রতি একটি মামলা হয়েছে। তাতে আসামি একজন।


মাদক স্পট নেই, মাদকের ভাসমান বেচাকেনা আছে
এলাকার মাদক স্পট প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভাষানটেকে এখন সুনির্দিষ্ট মাদক স্পট নেই। তবে মাদকের ভাসমান বেচাকেনা আছে। সেসব নিয়ে মামলা হচ্ছে। আমরা অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে আদালতে সোপর্দ করছি।

ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দেলোয়ার হোসেন। ছবি: নতুন আলো
ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ি, যানবাহনের অবৈধ পার্কিংসহ নানা কারণে এলাকার মূল সড়ক বেদখল হয়ে থাকার প্রসঙ্গে দেলোয়ার হোসেন বলেন- এখন এ ধরণের ঘটনা অনেক কমে এসেছে। আমাদের পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষনিক টহল দিচ্ছে। তাছাড়া এগুলো মূলত সিটি কর্পোরেশনের কাজ। তবুও আমরা অভিযোগ পেলে অ্যাকশনে যাই।


চাঞ্চল্যকর শাহ আলম হত্যাকাণ্ড
ভাষানটেকে সম্প্রতি সমকামিতার জেরে শাহ আলম হত্যাকাণ্ড ছিল চাঞ্চল্যকর ঘটনা। হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত গ্রেপ্তার রহমত উল্লাহ ভাষানটেকের মাটিকাটা এলাকায় দিনমজুরি করতেন। তাকে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১ জানুয়ারি ভাষানটেকের মাটিকাটা এলাকার একটি ভবনের পাঁচতলার চিলেকোঠার একটি কক্ষ থেকে শাহ আলমের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।


এ প্রসঙ্গে ভাষানটেক থানার ওসি মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, রহমত হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। এক থেকে দেড় বছর ধরে রহমত উল্লাহর সঙ্গে শাহ আলমের পরিচয়। অর্থের লোভ দেখিয়ে শাহ আলম তাকে সমকামে জড়ায়। এ থেকে ক্ষিপ্ত হয়েই সে শাহ আলমকে খুন করে বলে জানিয়েছে।

ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দেলোয়ার হোসেন। ছবি: নতুন আলো
দুই দশকের পুলিশ ক্যারিয়ার
পুলিশ পরিদর্শক মো. দেলোয়ার হোসেন ২০০১ সালে পুলিশে যোগ দেন টাঙ্গাইল সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে। ২০১২ সালে তিনি পুলিশ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। দেশের বিভিন্ন থানায় বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে বদলি হয়ে আসেন। বাড্ডা থানা ও ডিবি রমনা বিভাগে দায়িত্ব পালনের পর সবশেষ তিনি ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব লাভ করেন।


একনজরে মো. দেলোয়ার হোসেন
২০০১ পুলিশে যোগদান। উপ-পরিদর্শক, টাঙ্গাইল সদর থানা।
২০১২ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি; পদায়ন বিয়ানিবাজার থানা, সিলেট।
২০১৪ পরিদর্শক, জকিগঞ্জ থানা।
২০১৫ পরিদর্শক, বাড্ডা থানা, ডিএমপি
২০১৭ পরিদর্শক, রমনা গোয়েন্দা শাখা, ডিএমপি
২০২১ পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা), ভাষানটেক থানা, ডিএমপি


স্বপ্ন ছিল 'ব্যবসায়ি হব, প্রবাসী হব'
মো. দেলোয়ার হোসেনের জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৬। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে। বাবা ব্যবসায়ি কোমর আলী। মা ফাতেমা বেগম। দুজনেই মারা গেছেন। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দেলোয়ার সবার ছোট। মাতুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে মাধ্যমিক, কবি নজরুল কলেজ থেকে ১৯৯৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৯৬ সালে স্নাতক পাশ করেন তিনি। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ থেকে ২০০২ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দেলোয়ার হোসেন। ছবি: নতুন আলো
ব্যবসায়ি পরিবারের সন্তান দেলোয়ার হোসেনের স্বপ্ন ছিল ব্যবসায়ি হবেন, প্রবাসী হবেন। পুলিশে চাকরি করার স্বপ্ন ছিলো না তার। বন্ধু তৌহিদুল ইসলামকে নিয়ে হঠাৎ করেই পুলিশে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে শখের বশে চাকরির ইচ্ছা হয় তার। ‘চাকরি হলে হবে, না হলে নাই’ এমন প্রবণতা থেকে তেমন কোন প্রস্তুতি না নিয়ে প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে গেলেন তিনি। তৌহিদুল বাদ পড়লেন। এরপর লিখিত পরীক্ষা, ভাইবা, স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ অন্যান্য সব ধাপ শেষ করে চূড়ান্ত পর্বে নিয়োগ পেলেন পুলিশে। ২০০১ সালে টাঙ্গাইল সদর থানায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।


ছেলেকে আলেম বানাবো, পুলিশ নয়
দেলোয়ার হোসেন ২০০৭ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রী ইয়াসমিন হোসেন। তাদের তিন সন্তান- ২ মেয়ে (দিনা ও দিশা) ও ছেলে দিহান। একমাত্র ছেলে দিহান ভবিষ্যতে পুলিশে যোগদান করুক, তা তিনি চান না। তাকে মাদ্রাসায় পড়াতে চান, আলেম বানাতে চান।

ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দেলোয়ার হোসেন। ছবি: নতুন আলো
কর্মজীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত ১০ বছরে অসংখ্য চ্যালেঞ্জিং ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি। ২০০৮ সালের একটি সংঘবদ্ধ হত্যাসহ ডাকাতি মামলার তদন্ত ছিল মারাত্মক চাঞ্চল্যকর। আমি তখন মৌলভীবাজারের রাজনগর থানার সেকেন্ড অফিসার। সংঘবদ্ধ ডাকাত দলটি যাত্রী বেশে এক সিএনজি অটো রিকশা ছিনতাই করতে গিয়ে তারা চালককে খুন করে। সেই সিএনজি তারা অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। এই ঘটনার তদন্তভার ছিল আমার ওপর। লোমহর্ষক নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন জায়গায় সিএনজি চালকের লাশের সন্ধান, সিম ট্রেইস করে অপরাধীর সন্ধান, বিক্রি করে দেয়া সিএনজি অটো রিকশা উদ্ধার, আসামি গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র দাখিলসহ সব ঘটনা আমি ৮ দিনে সম্পন্ন করেছিলাম।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত