বৃহস্পতিবার । মে ১৯, ২০২২ । । ০৪:৫২ এএম

পাঁচ শতাধিক টেস্ট টিউব শিশু জন্ম দিতে পেরেছি আমরা: ডা. মোশতাক

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2021-05-06 14:44:41 BdST হালনাগাদ: 2021-11-10 18:05:28 BdST

Share on

ডা. মোশতাক আহমেদ, সায়েন্টিফিক ডিরেক্টর, হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ার। ছবি: নতুন আলো

স্বাভাবিক জীবনচক্রে সন্তান নারী-পুরুষের ভীষণ আরাধ্য। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, রোগব্যাধি ও পরিবেশগত রূপান্তরে বাড়ছে বন্ধ্যাত্ব। কখনো পুরুষের সমস্যা, কখনোবা নারীর। এমনকি সমস্যা হতে পারে উভয়ের। সারা বিশ্বে এ বন্ধ্যাত্বের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশে বন্ধ্যত্বের হার বাড়ছে এবং তা প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সূত্র বলছে নারীর তুলনায় পুরুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের হার ক্রমেই বাড়ছে। তবে এমন শঙ্কার মধ্যে আশার আলো ছড়াচ্ছে বন্ধ্যাত্ব নিরাময়ে আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও চিকিৎসকগণ।


এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকমের একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা হয় হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেশের প্রথম ভ্রুনতত্ত্ববিদ (এমব্রায়োলজিস্ট) ডা. মোশতাক আহমেদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি সৈনূই জুয়েল।
জেনেভা সফরে ডা. মোশতাক। ছবি: নতুন আলো

ডা. মোশতাক আহমেদ নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় আমি এ বিষয়ে আগ্রহী হই। সে সময় দেশের চিকিৎসা খাতে উন্নত প্রযুক্তির সংস্পর্শ খুব একটা ছিলনা। তবে অধিক সম্ভাবনাময় চিকিৎসা খাতের কয়েকটি উয়িং ছিল, যা নিয়ে কাজ করা গেলে চিকিৎসা খাতে বড় এবং অনন্য ভূমিকা রাখা যায়। চিকিৎসার কোন অংশ নিয়ে ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখা যাবে, তা নিয়ে আমরা বন্ধুরা আলোচনা করতাম। হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট নিয়ে কাজ করতে অনেকেই আগ্রহী ছিল তখন। আর আমি বন্ধ্যাত্ব নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেই। সরকারি পর্যায়ে এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ তো ছিলই না, বরং জনসংখ্যার চাপে সরকার দুই সন্তানে সীমাবদ্ধ থাকতে মানুষকে উৎসাহ দিতে লাগলো। কিন্তু যাদের সন্তান নেই, কিংবা হচ্ছেনা, তাদের ব্যাপারটি সরকারি পর্যায়ে অবহেলিত থেকে গেল।


যে সকল দম্পতি সঙ্গত কারণে সন্তান জন্ম দিতে পারেনা, সেই দম্পতির স্ত্রীর ডিম্বাণু শরীর থেকে বের করে এনে স্বামীর শুক্রাণুর সাথে টেস্ট টিউবের মধ্যে রেখে নিষিক্ত করে ২ থেকে ৩ দিন পর নিষিক্ত ডিম্বাণু ও শুক্রাণু স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপনের মধ্য দিয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করার পদ্ধতিই হচ্ছে টেস্টটিউব বেবি পদ্ধতি।


টেস্ট টিউব শিশু টেস্ট টিউবে জন্ম নেয় না
টেস্ট টিউব বেবির জন্ম টেস্ট টিউবে হয় না। এমনকি টেস্ট টিউব বেবি কৃত্রিম উপায়ে জন্ম নেয়া কোনো শিশুও নয়। টেস্ট টিউব বেবি হচ্ছে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। বন্ধ্যাত্ব নিরাময়ের বিভিন্ন কৌশলের একটি হচ্ছে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ।
হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারে ডা. মোশতাক। ছবি: নতুন আলো

ডা. মোশতাক বলেন, আইভিএফ পদ্ধতিতে স্ত্রীর পরিণত ডিম্বাণু ও স্বামীর পরিণত শুক্রাণু একটি বিশেষ পদ্ধতিতে (ল্যাপারেস্কোপিক পদ্ধতি) সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে ল্যাবে সংরক্ষণ করা হয়। স্বামীর পরিণত শুক্রাণু থেকে বেছে নেওয়া হয় সবচেয়ে ভালো জাতের একঝাঁক শুক্রাণু ছেড়ে দেওয়া হয় নিষিক্তকরণের লক্ষ্যে রাখা ডিম্বাণুর পেট্রিডিশে। ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর এই পেট্রিডিশটিকে তারপর সংরক্ষণ করা হয় মাতৃগর্ভের অনুরূপ একটি ইনকিউবিটরে।


ইনকিউবিটরের মধ্যে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পরই বোঝা যায় নিষিক্তকরণের পর ভ্রূণ সৃষ্টির সফলতা সম্পর্কে। ভ্রূণ সৃষ্টির পর সেটিকে একটি বিশেষ নলের মাধ্যমে জরায়ুতে সংস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়। জরায়ুতে ভ্রূণ সংস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পরই তা চূড়ান্তভাবে বিকাশ লাভের জন্য এগিয়ে যেতে থাকে এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয়। কোনো টেস্ট টিউবে এই শিশু বেড়ে ওঠে না।
হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারে ডা. মোশতাক। ছবি: নতুন আলো
বাঁ থেকে ব্রিগেডিয়ার (অব:) ডা. সুরাইয়া রহমান, জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান, অধ্যাপক শামসুদ্দিন সিদ্দিকী, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং ডা. মোশতাক আহমেদ। ছবিটি ২০০৯ সালের।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে আমার আরেকটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করি- আইসিএসআই বা ইন্ট্রা-সাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন। শুক্রানুর সংখ্যা, চেহারা বা গতিশীলতা ভাল না হলে এই পদ্ধতি কার্যকর। এটিও আইভিএফ পদ্ধতির মতই অপারেশনের মাধ্যমে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে তাতে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে শুক্রানু ঢূকিয়ে দেয়া হয়। এরপর প্রাপ্ত ভ্রূণকে স্ত্রীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।



উল্লেখ্য, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম টেস্ট টিউব বেবি লুইস ব্রাউনের জন্ম ১৯৭৮ সালের ১১ নভেম্বর ইংল্যান্ডে। বাংলাদেশে প্রথম টেস্ট টিউব বেবির জন্ম হয় ২০০১ সালের ২৯ মে ঢাকার একটি ক্লিনিকে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ডা. পারভীন ফাতেমা। বিয়ের ১৬ বছর পর এই টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতিতে একসঙ্গে তিন কন্যাসন্তান লাভ করেন ওই দম্পতি।

ডা. মোশতাক ও তার স্ত্রী ডা. ফারহানা আনাম। ছবি: নতুন আলো
ডা. মোশতাক বলেন, দেশের ৮ থেকে ১০ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে ৫ শতাংশের টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি গ্রহণ করে সন্তান ধারণ করতে পারেন। বাকিরা ওষুধের মাধ্যমে কিংবা ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা নিলেই নিরাময় সম্ভব। আমাদের এখানে যেসব রোগী আসেন তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ দম্পতি ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা নেন। বাকিদের টেস্ট টিউব পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। শুধু তাই নয়, টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দেয়ার পর কোন কোন দম্পতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন- এমন অনেক নজির আমাদের এখানে আছে।

যেভাবে হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটির যাত্রা
ডা. মোশতাক আহমেদ ১৯৯৭ সাল থেকে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ আইভিএফ সেন্টার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন, পরিকল্পনা করেন। ১৯৯৯ সালে দেশের বাইরে একটি আইভিএফ ল্যাবরেটরি স্থাপনে সক্রিয় অংশ নেন তিনি। ২০০২ সালে তিনি চারজন চিকিৎসকের সমন্বয়ে রাজধানীর বনানীতে হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ার নামে আইভিএফ চিকিৎসা কেন্দ্র চালু করতে সক্ষম হন। ফলে এটি দেশের দ্বিতীয় আইভিএফ ক্লিনিক। এটি যাত্রা শুরু করে বনানীতে। মাঝে এটি যুক্ত ইউনাইটেড হাসপাতাল ও ডিফাম হাসপাতালের সঙ্গেও।

বর্তমানে হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারের অবস্থা মিরপুর ১২ নম্বরে। ঠিকানা- বাড়ি ১০০, রোড ৬, ব্লক বি, মিরপুর ১২, পল্লবী, ঢাকা ১২১৬।  

হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারে ডা. মোশতাক। ছবি: নতুন আলো

ডা. মোশতাক আহমেদ বলেন, ২০০৩ সালে ১৪ ডিসেম্বর আমরা প্রথম টেস্ট টিউব বেবি জন্ম দিতে সক্ষম হই। আইভিএফ চিকিৎসায় আমাদের সাফল্য এখন ৪৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত আমরা ৫ শতাধিক শিশুর জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছি। বিগত দুই দশকে এই হচ্ছে আমাদের সাফল্য, আমাদের অর্জন।


তিনি বলেন, ২০০৭ সালে দেশে আমরাই প্রথম হিমায়িত ভ্রূণ (ফ্রোজেন এমব্রায়ো) প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে শিশু জন্ম দেয়ার সাফল্য অর্জন করি।

বিদেশ সফরে ডা. মোশতাক। ছবি: নতুন আলো
টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতিতে এক দম্পতির দুটি তিনটি শিশু জন্ম দেয়ার ব্যাপারটি হরহামেশাই লক্ষ্য করা যায়।


এ প্রসঙ্গে ডা. মোশতাক জানান, টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতিতে সাধারণত আমরা দুটি ভ্রূণ নিয়ে কাজ করি। ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে জমজ শিশু জন্ম নেয়। ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে একটি শিশু। আমাদের রোগীরাও সাধারণত একটি শিশুই চান।


ডা. মোশতাক আহমেদের জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৬৮। পৈতৃক বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব বাজার উপজেলায়। বাবা মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ছিলেন। মা মেহেরুননেসা গৃহিণী।
হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারে ডা. মোশতাক। ছবি: নতুন আলো

পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে ডা. মোশতাক তৃতীয়। ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি স্কুলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন ১৯৭৮ সালে। ১৯৮৪ সালে ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৮৬ সালে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৯৪ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন।


পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান বিদেশে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে তিনি রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিন বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ইংল্যান্ডের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

 

ডা. মোশতাক আহমেদ ১৯৯৬ সালে বিয়ে করেন। তার স্ত্রী ডা. ফারহানা আনামও একজন চিকিৎসক। তাদের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। প্রথম সন্তান লামিয়া আহমেদ রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে ৪র্থ বর্ষে পড়ছেন। দ্বিতীয় সন্তান রাফিদা আহমেদ বিএএফ শাহিন কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ছে। তৃতীয় সন্তান আহমেদ আব্দুল বারি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। ছোট মেয়ে ফাইজা মেহরিন আহমেদ দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারে ডা. মোশতাক। ছবি: নতুন আলো

ডা. মোশতাক আহমেদ ২০০৭ সালে আমেরিকান সোসাইটি অব রিপ্রোডাকশন মেডিসিন কর্মসূচীতে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। একই বছর তিনি স্টেম সেল গবেষণায় দক্ষিণ কোরিয়ার একটি দলের সঙ্গে অংশ নেন। ২০১০ সালে তিনি ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি কর্মসূচীতে যোগ দেন। তিনি প্রতিবছর এ সোসাইটির বার্ষিক আয়োজনে অংশ গ্রহণ করে আসছেন। তিনি ইংল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, তুরস্কে অনুষ্ঠিত এ সোসাইটির বার্ষিক কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন।


ডা. মোশতাক আহমেদের স্ত্রী ডা. ফারহানা আনাম হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারের একজন পরিচালক। মেডিকেল ডিরেক্টর পদে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ডা. মো: রুহুল কুদ্দুস ।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত