বৃহস্পতিবার । জুলাই ৭, ২০২২ । । ০৭:১৭ এএম

আবাসন শিল্প

সক্ষমতার বাইরে আমরা প্রকল্প নেই না: আশরাফ হোসেন

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2022-06-12 14:41:58 BdST হালনাগাদ: 2022-06-15 23:26:10 BdST

Share on

মো. আশরাফ হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আপন নিবাস লিমিটেড। ছবি: নতুন আলো

‘আমি আমার নিজের বাড়ি নিজে করেছি। এ ছয় তলা বাড়ি করতে গিয়ে ভবন নির্মাণের নানা খুঁটিনাটি বিষয় জেনেছি। ভবনের নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সবগুলো ধাপে নিজে যুক্ত থেকেছি। ভবনের গাঁথুনি, কলাম ঢালাই, ছাদ ঢালাই, রডের বাইন্ডিংসহ সিভিল কাজ, ইলেকট্রিক্যাল কাজ- সবকিছু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। বাড়ি নির্মাণের প্রতিটি কাজে আমি যুক্ত থেকেছি। এভাবেই আমার আবাসন ব্যবসার শুরু।’

নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকমের একান্ত সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলছিলেন আবাসন কোম্পানি আপন নিবাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফ হোসেন। সাক্ষাৎকারে উঠে এসছে তার কর্ম ও ব্যক্তিজীবনের নানা অনুষঙ্গ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈনূই জুয়েল।

আপন নিবাস লিমিটেডের একটি অনুষ্ঠানে মো. আশরাফ হোসেন, সঙ্গে সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ সহ আরও অনেকে। ছবি: সংগৃহীত

| আপন নিবাস লিমিটেডের একটি অনুষ্ঠানে মো. আশরাফ হোসেন, সঙ্গে সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ সহ আরও অনেকে। ছবি: সংগৃহীত

 

মিরপুরের পল্লবীতে অবস্থিত আপন নিবাস লিমিটেডের কার্যক্রম ২০০৮ সালে শুরু হয়। তবে ২০১০ সালের ৪ মার্চ কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা করে। আপন নিবাস লিমিটেডের মালিক ১০ জন। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আলী আহমেদ কোম্পানির চেয়ারম্যান। বাকি ৮ জন আছেন পরিচালক পদে।


আশরাফ হোসেন বলেন, কোম্পানির প্রথম প্রকল্প হস্তান্তর করা হয় ২০১২ সালে। এরপর প্রতি বছর একটি করে প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন করেছি আমরা।


আমরা আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রকল্প নেই
তার সঙ্গে আলাপে জানা যায়, ২০১৬ সালে তারা দুটি প্রকল্প হাতে নেন। এ পর্যন্ত কোম্পানির সম্পন্ন প্রকল্প ১২টি। চলমান প্রকল্প ৩টি।

মিরপুর ১০-এ আপন নিবাসের কার্যালয়ে মো. আশরাফ হোসেন। ছবি: নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

| মিরপুর ১০-এ আপন নিবাসের কার্যালয়ে মো. আশরাফ হোসেন। ছবি: নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

কোম্পানির সাফল্য ও অগ্রগতি প্রসঙ্গে আশরাফ হোসেন বলেন, আমরা আমাদের সক্ষমতার বাইরে প্রকল্প গ্রহণ করিনা। ফলে আমরা সময়মত নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারি। আমরা গ্রাহকদের দেয়া কথা রাখতে পারি। আমাদের কাছে জমি দিতে চায় এমন বহু জমির মালিক আছেন। কিন্তু আমরা সব প্রকল্প নিতে পারি না, নেই না। আমরা আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী নির্মাণ কাজে হাত দেই। ফলে বিগত এক যুগে আমাদের সম্পন্ন প্রকল্প মাত্র ১২টি। এবং সবগুলো প্রকল্পই আমরা নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পেরেছি। এমন কি কিছু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের আগেও শেষ করতে পেরেছি।


কোম্পানির মাইলফলক ও বড় প্রকল্প কোনটি জানতে চাইলে, তিনি বলেন, শেফা মাদবর টাওয়ার আমাদের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রকল্প।


মিরপুর ১০ নম্বরে আপন নিবাস লিমিটেডের অফিসের সামনে অবস্থিত ১০ তলা এ ভবনটি একটি আবাসিক ভবন। সাড়ে ১১ কাঠা জমিতে নির্মিত হয়েছে শেফা মাদবর টাওয়ার। এতে আছে ৩৫টি বিভিন্ন আকারের ফ্ল্যাট।

লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা রোজ ভ্যালী’র (জেলা ৩১৫ এ২) একটি অনুষ্ঠানে মো. আশরাফ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

| লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা রোজ ভ্যালী’র (জেলা ৩১৫ এ২) একটি অনুষ্ঠানে মো. আশরাফ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

 

তিনি বলেন, আমাদের কোম্পানির মূলমন্ত্র হল- সময়মত হতান্তর এবং গুণগতমানের নির্মাণ।


অনুমোদন জটিলতায় ভোগান্তি অনেক
ভবন নির্মাণে কি ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় জানতে চাইলে আশরাফ হোসেন বলেন, নির্মাণকাজ চলাকালীন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের (কমার্শিয়াল বিলের চেয়ে বেশি) চাপ, অতিরিক্ত ফ্ল্যাটগুলোতে গ্যাস সংযোগ না পাওয়া, রাজউকের নকশা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রীতা, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ফ্ল্যাটের বিক্রয় অনুমতি (সেল পারমিশন) পেতে অনেক জটিলতা পোহাতে হয়, ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এতে প্রকল্পের সার্বিক কাজ নানা দিক থেকে বাধাগ্রস্ত হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা যায় না। তাছাড়া প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।


রাজউকের নতুন নিয়ম চালু হবার একটি খসড়া অনুমোদন হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে বিভিন্ন এলাকাভেদে আট তলা উচ্চতার বেশি কোন ভবন নির্মাণ করা যাবেনা।

মিরপুর ১০-এ আপন নিবাসের কার্যালয়ে মো. আশরাফ হোসেন, পাশে ঢাকা ১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

| মিরপুর ১০-এ আপন নিবাসের কার্যালয়ে মো. আশরাফ হোসেন, পাশে ঢাকা ১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

 

এ প্রসঙ্গে আশরাফ হোসেন বলেন, রাজউকের এ নিয়মটি জনবান্ধব নয়। এমনকি আবাসন ব্যবসাবান্ধবও নয়। এতে করে আগামীতে ঢাকা শহর আবাসন সংকটে ভুগবে। তাছাড়া ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে আবাসন খাতে নতুন সংকট দেখা দেবে।


গ্যাসের সংযোগ সংক্রান্ত প্রসঙ্গে আশরাফ হোসেন বলেন, অন্তত যেসব বাড়িতে ইতোমধ্যে গ্যাস সংযোগ আছে, সেসব বাড়ি বহুতল করা হলে সব ফ্ল্যাটেই যেন গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়। কারণ ক্রেতারা তিতাসের গ্যাস সংযোগ ছাড়া ফ্ল্যাট কিনতে চাননা।


সহজ হোক ব্যাংকঋণ
ফ্ল্যাট ব্যাংকঋণ জটিলতা প্রসঙ্গে আশরাফ হোসেন বলেন, ফ্ল্যাট কেনায় গ্রাহকদের ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ঋণদান পদ্ধতি এবং শর্ত আরও সহজ ও শিথিল করা জরুরী। কেননা ঋণ পেতে গ্রাহকদের খুব জটিল এবং কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।


এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, একটি বহুতল ভবন নির্মাণের বিভিন্ন ধাপে ভূমি অফিস, গৃহায়ন অধিদপ্তর, রাজউক, তিতাস, ডেসকো, সিটি কর্পোরেশনের নানা রকম সেবা নিতে হয়। আর সেসব সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। অকারণ সময় নষ্ট হয়। ঠুনকো অজুহাতে একাধিকবার কাগজপত্র জমা দিতে হয়। দিনের পর দিন ফাইল আটকে থাকে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ।


নিজের আবাসন কোম্পানির বাইরে পল্লবীর কোন আবাসন কোম্পানিকে ভাল কোম্পানির তালিকায় ফেলবেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে আশরাফ হোসেন নোভা হোল্ডিংস লিমিটেডের নাম উল্লেখ করেন।

মিরপুর ১০ নম্বরে রাইসিং সান কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের একটি অনুষ্ঠানে মো. আশরাফ হোসেন মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোঃ তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিচ্ছেন, সঙ্গে সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ সহ আরও অনেকে। ছবি: সংগৃহীত

| মিরপুর ১০ নম্বরে রাইসিং সান কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের একটি অনুষ্ঠানে মো. আশরাফ হোসেন মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোঃ তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিচ্ছেন, সঙ্গে সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ সহ আরও অনেকে। ছবি: সংগৃহীত

 

সংগঠন ও রাজনীতি
আশরাফ হোসেন ২০০৪ সাল থেকে লায়ন্স ক্লাবের সাথে যুক্ত আছেন। লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা রোজ ভ্যালী’র (জেলা ৩১৫ এ২) গত মেয়াদে সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি এ ক্লাবের আইপিপি (ইমিডিয়েট পাস্ট প্রেসিডেন্ট)।


আশরাফ হোসেনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা বহু আগে থেকেই।


১৯৯৩ সালে গঠিত মিরপুর যুব উন্নয়ন ব্যবসায়ি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ২০০৭ সালে গঠিত একতাই বল ব্যবসায়ি বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ১৯৯৮ সালে গঠিত সোনালী বহুমুখী ব্যবসায়ি সমিতি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিনি।


আশরাফ হোসেন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন। পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক তিনি।

মিরপুর ১০-এ আপন নিবাসের কার্যালয়ে মো. আশরাফ হোসেন। ছবি: নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

| মিরপুর ১০-এ আপন নিবাসের কার্যালয়ে মো. আশরাফ হোসেন। ছবি: নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

শ্রীনগর থেকে মিরপুর
মো. আশরাফ হোসেনের জন্ম ১৯৬৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায়। বাবা প্রয়াত আবুল কালাম আজাদ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মা আশুরা বেগম। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আশরাফ হোসেন বড়। সঙ্গত কারণে পড়াশোনায় বেশি দূর এগুতে পারেননি তিনি।


আশরাফ হোসেন ২০০০ সালের ২৭ জানুয়ারি বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম হালিমা সাদিয়া। তাদের চার ছেলেমেয়ে। বড় সন্তান মোহাম্মদ কায়েস হোসেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেছে। দ্বিতীয় সন্তান মো. আরাফাত হোসেন বিএ গ্রীনহার্ট কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র। তৃতীয় সন্তান রাবেয়া বসরি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট সন্তান ছয় বছর বয়সী মো. আব্দুল্লাহ। তিনি সপরিবার মিরপুর ১০ নম্বরে বসবাস করেন।

নিজের ছাদ বাগানে আশরাফ হোসেন (বাঁয়ের ছবিতে), ও তার ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ (ডানের ছবিতে)। ছবি: সংগৃহীত

| নিজের ছাদ বাগানে আশরাফ হোসেন (বাঁয়ের ছবিতে) ও তার ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ (ডানের ছবিতে)। ছবি: সংগৃহীত

 

অবসরে সেবামূলক কাজ করেন আশরাফ হোসেন। ভালবাসেন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে। পছন্দ করেন বেড়াতে।


তবে গাছপালা, প্রকৃতি আশরাফ হোসেনকে ভীষণ টানে। ভালবাসেন বাগান করতে। নিজের আড়াই কাঠা বাড়ির ছাদজুড়ে তিনি বাগান করেছেন। কয়েক প্রকারের আমগাছ, জামরুল গাছ, আনারস, লেবু, বেলেবুসহ অন্তত শতাধিক ফল ও ফুলের গাছ রয়েছে তার ছাদ বাগানে। এছাড়া তার ছাদবাগানে বিভিন্ন প্রকার সবজিও। সময় সুযোগ পেলেই বাগানে সময় দেন, গাছের পরিচর্যা করেন।

আশরাফ হোসেনের তিন সন্তান- রাবেয়া বসরি, আরাফাত হোসেন ও আব্দুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

| আশরাফ হোসেনের তিন সন্তান- রাবেয়া বসরি, আরাফাত হোসেন ও আব্দুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

 

ব্যক্তিজীবনে মো. আশরাফ হোসেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। ধর্মীয় অনুশাসনে অভ্যস্ত এই মানুষটি ২০১২ সালে বাবা মাকে নিয়ে হজ পালন করেছেন।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত