মঙ্গলবার । আগস্ট ২০, ২০১৯ । । ১০:২৩ এএম

প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি অনেক বেশি: ডা. জেরীন দিলাওয়ার

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2019-07-25 11:41:54 BdST হালনাগাদ: 2019-07-27 19:22:47 BdST

Share on

অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন পেশায় একজন অবেদনবিদ (অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ)। কর্মরত আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগে গবেষণা সহকারী হিসেবে। আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন জন্টা ইন্টারন্যাশনাল’র ডিসট্রিক্ট ২৫ এরিয়া ২ এর ভাইস এরিয়া ডিরেক্টর তিনি।

 

সম্প্রতি নতুন আলো টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেনের কর্মজীবন, ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের নানা অনুষঙ্গ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈনূই জুয়েল।

ডা. জেরীন সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন

সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের হাত থেকে উইংস সম্মাননা পুরস্কার ২০১৬ নিচ্ছেন ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

 

‘বাবার স্বপ্ন ছিল আমি ডাক্তার হব। যদিও সুনির্দিষ্ট কোন পেশা নিয়ে আমার ভাবনা ছিলনা। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর তাই বাবার ইচ্ছেটাকে প্রাধান্য দিয়ে সেভাবেই প্রস্তুতি নিলাম। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পাই। এমবিবিএস পাশ করি।’

 

এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর ডা. জেরীন ঢাকায় গাইনী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সুরাইয়া জেবিনের তত্ত্বাবধানে এক বছর চিকিৎসা চর্চা করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে তিনি অ্যানেসথেসিয়োলজিতে স্নাতকোত্তর (পোস্ট গ্র্যাজুয়েট) সম্পন্ন করেন।

 

তিনি বলেন, আমাদের পুরো ব্যাচে ছেলেদের পাশাপাশি আমরা মাত্র দুইজন মেয়ে ছিলাম। আমাদের ব্যাচের মধ্যে আমি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি।

অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

ডা. জেরীন কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৯৪ সালে। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার পদে যোগ দেন তিনি। ২০০৩ সাল পর্যন্ত একটানা কর্মরত ছিলেন তিনি।

 

‘২০০৩ সালে আমি দিল্লীর এসকর্ট হার্ট ইন্সটিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে অধ্যাপক ডা. যতীন মেহতার তত্ত্বাবধানে বিটিং হার্ট সার্জারি অ্যানেসথেসিয়া বিষয়ে ফেলোশিপ করেছি।’

 

দেশে ফিরে তিনি ঢাকার আল হেলাল স্পেশ্যালাইজড হাসপাতালে কোলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হিমাংশু দাস মহাপাত্রর সহযোগী হিসেবে এক বছর অ্যানেসথেসিয়া বিষয়ে চর্চা করেন।

 স্বামী ইফতেখার করিমের সঙ্গে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

স্বামী ইফতেখার করিমের সঙ্গে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

 

‘২০০৬ সালে অ্যাপলো হাসপাতাল যাত্রা শুরু করে। আমি এখানে জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদে যোগ দেই। এক বছর কর্মরত ছিলাম।’

 

২০০৮ সালে তিনি পুনরায় হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যোগ দেন সিনিয়র কন্সালট্যান্ট পদে। কর্মরত ছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। সে সময় তিনি ছিলেন হাসপাতালের একমাত্র নারী অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ।

 

‘২০১৪ সালের ২৪ জুন বাবা মারা যান। ওই দিনটিই ছিল হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে আমার শেষ কর্ম দিবস। বাবার চলে যাওয়া আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে। খুব অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম আমি। ভীষণ এক শূন্যতা আমাকে তাড়িত করত।’

 বাল্য বিবাহ রোধে বৃহত্তর ঢাকা জন্টা ক্লাবের সদস্যদের কর্মসূচীতে আছেন ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে বৃহত্তর ঢাকা জন্টা ক্লাবের কর্মসূচীতে ক্লাবের সদস্য ও নেতৃবৃন্দ

 

বছরজুড়ে সীমানা পেরিয়ে
ডা. জেরীন বলেন, ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে পরের বছর সেপ্টেম্বর নাগাদ পুরোটা সময়জুড়ে আমি নানা দেশে ঘুরে বেরিয়েছি। লন্ডন, সাইপ্রাস, ভিয়েনা, রোম, জার্মানি, ইস্তাম্বুলসহ অনেকগুলো শহর, দ্বীপ ঘুরে বেরিয়েছি। প্রায় ২০টির অধিক দেশে বেড়ানো হয়েছে ওই সময়টাতে। এর মধ্যে বিশেষ ভালো লেগেছে সেন্ট পিটার্সবার্গ (রাশিয়া) ও সল্জবার্গ (অস্ট্রিয়া)। নানা দেশের নানা সংস্কৃতি, জীবনযাপন, নিসর্গ দেখার বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার।

 

প্যালিয়েটিভ রুগী, যাদের শেষ দিন পর্যন্ত বাঁচতে শেখানো হয়
‘দেশে ফিরে আমি যোগ দিলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারের প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগে গবেষণা সহকারী পদে। অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদের তত্ত্ববধানে ও নেতৃত্বে বিএসএমএমইউতে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা হয়। সম্প্রতি (জুলাই মাসে) তিনি অবসরে গেছেন। তিনিও একজন অ্যানেসথেসিয়োলজিস্ট।’

 বাংলাদেশ প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটির কার্যক্রমে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

বাংলাদেশ প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটির কার্যক্রমে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

 

প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জীবন সীমিতকারী নিরাময় অযোগ্য রুগীদের নিয়ে কাজ করে বিএসএমএমইউ’র প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার। এসব রুগীরা বড় ও কঠিন রোগের পাশাপাশি কোষ্ঠ-কাঠিন্য, তীব্র ব্যাথা, খেতে না পারাসহ নানা জটিলতা নিয়ে জীবনযাপন করেন। তাদেরকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক- এই চারটি বিষয়ে আমরা উৎসাহিত করি। বেঁচে থাকাকে তাদের কাছে অর্থবহ করে তুলি। প্যালিয়েটিভ রুগীদের আমরা তাদের শেষ দিন পর্যন্ত বাঁচতে শেখাই।

 

সামাজিক দায় এড়াতে পারিনা
এ ধরণের রুগীদের মধ্যে যারা অস্বচ্ছল, দরিদ্র, তাদের জন্য বিশেষভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি। ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন চলতি (২০১৮-২০২১) মেয়াদে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ সমিতি (বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিয়োলজিস্টস), ক্যান্সার সোসাইটি বাংলাদেশ’র জীবন সদস্য। এছাড়াও তিনি ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব কার্ডিওথোরাসিক অ্যানেসথেসিয়া’র জীবন সদস্য। যুক্ত আছেন সার্ক ওমেন’স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে। তিনি এর সাবেক মহাসচিব।

 

ডা. জেরীন বলেন, প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটিতে আমরা ১৬৬ জন জীবন সদস্য আছি। চিকিৎসকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এ সোসাইটির সদস্য। তাদের আর্থিক সহযোগিতায় এ সোসাইটি চলছে। এ সোসাইটি থেকে আমরা নানা রকম শুশ্রূষামূলক কাজ করি। হাসপাতালের চারপাশে ১২ কিমি পর্যন্ত দূরত্বে থাকা বিভিন্ন প্যালিয়েটিভ রুগীদের আমরা বিনামূল্যে তাদের বাসায় গিয়ে সেবা দেই। তাদেরকে দেখতে যাওয়া, তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া ইত্যাদি।

 ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন, গবেষণা সহকারী, প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগ, বিএসএমএমইউ

ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন, গবেষণা সহকারী, প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগ, বিএসএমএমইউ

 

‘আমাদের সোসাইটির একটি মডেল প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পের নাম ‘মমতাময়ী কড়াইল’। বনানী টি অ্যান্ড টি কলোনি সংলগ্ন কড়াইল বস্তিতে আমাদের কার্যক্রম। আমরা সেখানকার বিশেষ শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের (স্প্যাস্টিক চাইল্ড) সেবা দিচ্ছি- খাবার, ওষুধ ও ফিজিওথেরাপি প্রদানের মাধ্যমে। শুরুতে এ প্রকল্পে বিশ্ব হসপিস প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যালায়েন্স (ডব্লিউএইচপিসিএস) অর্থায়ন করলেও বর্তমানে রোটারি ক্লাব (ঢাকা মেট্রোপলিটন), দানশীল বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটির অর্থায়নে এ প্রকল্প চলছে।’

 

ডা. জেরীন দিলাওয়ার যুক্ত আছেন নারী উন্নয়নের আন্তর্জাতিক সংগঠন জন্টা ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে। তিনি জন্টা ইন্টারন্যাশনাল ডিসট্রিক্ট ২৫ এরিয়া ২ এর ভাইস এরিয়া ডিরেক্টর। ২০১২ সালে ডা. জেরীন, টুটলি রহমান ও দিলরুবা আহমেদের যৌথ চেষ্টায় গড়ে ওঠে বৃহত্তর ঢাকা জন্টা ক্লাব। এটি জন্টা ইন্টারন্যাশনালের ঢাকাভিত্তিক অন্যতম সংগঠন। পিছিয়েপড়া মেয়েশিশু ও নারীদের স্বাবলম্বী করতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণভিত্তিক নানা রকম সহায়তা দিয়ে আসছে সংগঠনটি।

 

তিনি বলেন, সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতা নিতে হবে। দরিদ্র, রোগাক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সামাজিক দায় এড়িয়ে যেতে পারিনা।

 সামনের সারিতে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন (ডানে) ও দিলরুবা আহমেদ (বাঁয়ে)

সামনের সারিতে দিলরুবা আহমেদ (বাঁয়ে) ও ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন (ডানে)

 

চলতি বছর (এপ্রিল ২০১৯) যাত্রা শুরু করে ইনভিক্টা ফার্মা কেয়ার লিমিটেড নামে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। এর ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাজেদুল হান্নান।

 

ইনভিক্টা ফার্মা প্রসঙ্গে ডা. জেরীন বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসায় কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরী ওষুধ রয়েছে, যেগুলো না পাওয়ার কারণে চিকিৎসকরা দিতে পারেন না। অত্যন্ত অপরিহার্য এমন সব ওষুধ নিয়ে কাজ করবে আমাদের ইনভিক্টা ফার্মা কেয়ার।

 

টেলিভিশনে নিয়মিত গান গাইতাম
জেরীন শৈশব থেকে গানের চর্চা করতেন। দেশের প্রখ্যাত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে তিনি গান গেয়েছেন। ‘ছোট্ট বেলার পুতুল খেলার সঙ্গীদের কোথায় খুঁজে পাই’ তার গাওয়া একটি জনপ্রিয় গান। তিনি ‘সোনা বৌ’ সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন। শুধু তাই নয় তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন তালিকাভুক্ত ‘এ’ শ্রেণির সংগীত শিল্পী। ১৯৮১-১৯৮৮ সময়কালে তিনি টেলিভিশনে নিয়মিত গান গেয়েছেন। দেশের স্বনামধন্য সুরকার সত্য সাহা, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আজাদ রহমান, রাজা হোসেন খানসহ অনেক খ্যাতনামা সুরকারের সুরে গান গেয়েছেন ডা. জেরীন।

 ঘরোয়া পরিসরে গান পরিবেশন করছেন ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

ঘরোয়া পরিসরে গান পরিবেশন করছেন ডা. জেরীন

 

তবে ‘নানা ব্যস্ততার কারণে এখন আর আনুষ্ঠানিক অঙ্গনে গান গাওয়া হয় না। তবে ঘরোয়া পরিসরে অল্পস্বল্প গানের চর্চা হয়।’

 

ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন এসএ টিভিতে ডক্টর্স ভয়েস নামে একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন। ২০১৩-২০১৪ সময়ে প্রায় এক বছর তিনি ইংরেজি ভাষার এ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন।

 

মোটেও ভোজনবিলাসী নই
জেরীন দিলাওয়ার হোসেনের দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রসঙ্গে জানা যায়- তিনি প্রতিদিন সকাল ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। নামাজ পড়েন। সাড়ে ৭টায় তিনি তার কর্মস্থল বিএসএমএমইউ’র উদ্দেশ্যে রওনা হন। তার সকালের নাশতায় ২টি পোচড ডিম আর টোস্ট, দুপুরের খাবারে ভাত, মাছ, সবজি এবং রাতের খাবারে থাকে সবজি স্যুপ। বাইরে খাবার সাধারণত এড়িয়ে চলেন। সপ্তাহে তিন দিন ব্যায়ামাগারে এক ঘণ্টা করে শরীর চর্চা করেন। রাত ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন।

 ছেলে ওয়াজদান ও মেয়ে সামানীর সঙ্গে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

ছেলে ওয়াজদান ও মেয়ে সামানীর সঙ্গে ডা. জেরীন দিলাওয়ার 

 

তিনি বলেন, আমি মোটেও ভোজনবিলাসী নই। ভরপুর খাওয়া-দাওয়া আমার পছন্দ নয়। আমি খুব ডিসিপ্লিন্ড (নিয়মানুবর্তী) জীবনযাপন করি।

 

বই লিখছি
এক প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডা. জেরীন বলেন, প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারে চিকিৎসাধীন এক তরুণী ছিল। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জে। তার মুখ গহ্বরে ক্যান্সার ছিল। পড়াশোনা জানা মেয়ে ছিল সে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার কারণে তার মুখ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। কথা বলতে তার কষ্ট হত। ফলে সে খুব একটা কথা বলত না। তার সঙ্গে একটু সখ্যতা হবার পর তাকে বললাম, তোমার যেহেতু কথা বলতে কষ্ট হয়, তুমি আমাকে চিঠি লিখবে। তাতে তোমার ইচ্ছা আর ভাবনার কথা লিখবে। যখন দেখা হবে, সেই চিঠি আমাকে দিবে। সে তাই করল। জানলাম তার একটি ইচ্ছে- তার ভাইয়ের চাকরি হবে। প্রথম মাসের বেতনের টাকা তার ভাই তার হাতে তুলে দিবে। আমি আমার ছোট ভাইকে বলে তার ভাইয়ের জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করলাম। মেয়েটির সে কি আনন্দ! তার আনন্দ দেখে আমার আনন্দের কোন কমতি ছিলনা। সে এক ভীষণ অন্যরকম ভালোলাগা, যা বলে বোঝানো যাবে না।

 সাবেক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী ফারুক খানের হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

সাবেক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী ফারুক খানের হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন ডা. জেরীন 

 

‘এমন অসংখ্য ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি আমি। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বই লেখার কাজে হাত দিয়েছি। আগামিতে নিউ ইয়র্ক থেকে বইটি প্রকাশ করব।’

 

ভালো বন্ধুর ছোট তালিকা
‘আমার বন্ধুবান্ধব খুব বেশি নয়। ভালো বন্ধুর সংখ্যা কম। আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু রীমা পাঞ্জাবী। ওর সঙ্গে আমার ৩০ বছরের বন্ধুতা- সেই একই রকম আর অনবদ্য। যদিও ও আমার সহপাঠী ছিলনা। ও কোলকাতার মেয়ে। আমার আরেক জন ভালো বন্ধু ডা. তানজিনা হক। সে রয়্যাল ফ্রি লন্ডন এর ক্লিনিক্যাল লিড কনসালট্যান্ট ভাইরোলজিস্ট। আমরা সহপাঠী ছিলাম।’

 বন্ধু রীমা পাঞ্জাবী (বাঁয়ে) ও তানজিনা হকের (ডানে) সঙ্গে ভিন্ন দুটি ছবিতে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন।

বন্ধু রীমা পাঞ্জাবী (বাঁয়ে) ও তানজিনা হকের (ডানে) সঙ্গে ভিন্ন দুটি ছবিতে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

 

অনেক বই পড়ি, প্রচুর গান শুনি
আমার অবসর বিনোদনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ বই আর সঙ্গীত। ভারতীয় নিউরোসার্জন ও লেখক ডা. পল কালানিথির ‘হোয়েন ডেথ বিকামস এয়ার’ আমার ভীষণ অন্যতম পছন্দের বই। প্রচুর গান শুনি- ধ্রুপদী, গজল, রাগপ্রধান। ভীষণ ভালো লাগে ঘর সাজাতে।

 

দেয়ার মাঝেই পাওয়া
পেশাগত, সামাজিক ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও ভালোলাগা থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে কাজ করে আসছি। নগরীর বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে বেড়িয়েছি। দুরারোগ্য মানুষের সান্নিধ্যে এসেছি। অভাবী মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি, জন্টা ইন্টারন্যাশনাল থেকে আমরা জনকল্যাণে নানা কর্মসূচী করে আসছি সারা বছরজুড়ে। মানুষকে দেয়ার মাঝেই নির্মল আনন্দ, জীবনের সার্থকতা- এটিই আমার জীবনবোধ।

 দুরারোগ্য রুগীর কল্যাণে নগরীর অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন

দুরারোগ্য রুগীর খোঁজ-খবর নিতে নগরীর অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান ডা. জেরীন

 

যাকে আদর্শ বলে মানি
সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট দিলরুবা আহমেদ আমার ঘনিষ্টজন। তিনি আমার শৈশব শিক্ষকও। আমি তার দ্বারা অনুপ্রাণিত, প্রভাবিত। চট্টগ্রাম জন্টা ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। জন্টা ডিস্ট্রিক্ট ২৫ এর সেন্টিনিয়েল কমিটির চেয়ারম্যান তিনি। তার আরেকটি পরিচয় তিনি চট্টগ্রাম শহরের কাতালগঞ্জে অবস্থিত লিটল জুয়েলস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ।

 

পেছনে ফিরে তাকাই না
এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. জেরীন বলেন, আমার জীবনে উল্লেখযোগ্য কোন ভুল নেই। আই ডোন্ট রিগ্রেট (আমার কোন অনুতাপ নেই)। আই ডোন্ট লুক ব্যাক (আমি পেছনে ফিরে তাকাই না)। অতীত নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমার যা কিছু প্রাপ্তি, তা আমার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। আমি তাতে সন্তুষ্ট। পেশাগত কারণে খুব কাছ থেকে অনেক মৃত্যু, অনেক যাতনা দেখেছি। কখনো ভেঙ্গে পড়িনি। এভ্রিথিং ইস অ্যাচিভেবল, নাথিং ইজ রকেট সাইন্স (সবকিছু অর্জন করা সম্ভব, কোন কিছুই রকেট বিজ্ঞান নয়)।

 এসএ টিভির ডক্টর্স ভয়েস নামে একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতেন ডা. জেরীন দিলাওয়ার করিম

এসএ টিভির ডক্টর্স ভয়েস নামে একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতেন ডা. জেরীন দিলাওয়ার করিম

 

উন্নয়নের জন্য সুশাসন জরুরী
রাজনীতি ও দেশভাবনা নিয়ে জেরীন বলেন, এই একটি জিনিস নিয়ে কখনো আগে ভাবিনি। রাজনীতি। তবে আগামীতে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হব। কোন দলে যুক্ত হব- তা সময়য়ই বলে দেবে। আমি উন্নয়নকামী মানুষ। তবে সুশাসনের অপরিহার্যতায় বিশ্বাস করি। কারণ প্রকৃত উন্নয়নের জন্য সুশাসন জরুরী।

 

ইনভিক্টা নিয়ে বড় স্বপ্ন
আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আমাদের ইনভিক্টা ফার্মা কেয়ার নিয়ে। ইনভিক্টাকে আমি একটি দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছাতে চাই। যেহেতু আমাদের নতুন প্রতিষ্ঠান, তাই এ নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে। আমরা সেভাবেই এগুচ্ছি। দেশের ওষুধ খাতে কার্যকর ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চাই আমরা।

 ইনভিক্টা ফার্মা কেয়ার লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন, পাশে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাজেদুল হান্নান (বাঁয়ে)

ইনভিক্টা ফার্মা কেয়ার লিমিটেডের সিইও ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন, ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাজেদুল হান্নান (বাঁয়ে)

 

বাবা-মায়ের খুব আদুরে ছিলাম
ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেনের জন্ম ১ অক্টোবর। চট্টগ্রামের লালখানবাজারে। তবে তার পৈত্রিক বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। বাবা দিলাওয়ার হোসেন। মা মনোয়ারা হোসেন। দিলাওয়ার হোসেন পেশায় পুলিশ সুপার ছিলেন। চট্টগ্রামে তিনি এসপি দিলাওয়ার নামে বেশ সুপরিচিত ছিলেন। পরে তিনি ব্যবসায়ি হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

 

সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর দিলাওয়ার হোসেন দ্য ক্যারিয়ার্স লিমিটেড নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় তার ছয়টি তেলের ট্যাংকার, দুটি সিনেমা হল- চট্টগ্রামের আলমাস ও দীপিকা সিনেমা হল ও একটি পণ্যবাহী লঞ্চ (জেরীন) ছিল।

 

পরিবারে দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জেরীন তৃতীয়। সবার বড় জোবায়ের হোসেন একজন কম্পিউটার প্রকৌশলী, বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর জেবা দিলাওয়ার, একজন গৃহিণী। চতুর্থ অবস্থানে থাকা জেরীনের ছোট ভাই জিয়া হোসেন একজন ব্যবসায়ি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নোবেল হাউজ’র স্বত্বাধিকারী তিনি।

 বাবা দিলাওয়ার হোসেনের (বাঁয়ে) সঙ্গে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন ও ডানে পৃথক ছবিতে মা মনোয়ারা হোসেন

বাবা দিলাওয়ার হোসেনের (বাঁয়ে) সঙ্গে ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন ও ডানে পৃথক ছবিতে মা মনোয়ারা হোসেন

 

জেরীনের শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামের লালখানবাজারে। স্থানীয় সেন্ট মেরী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। পড়াশোনায় মেধাবী জেরীন সেন্ট স্কলাস্টিকা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে চারটি বিষয়ের লেটার নম্বরসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৮৯ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে অ্যানেসথেসিয়োলজিতে স্নাতকোত্তর (পোস্ট গ্র্যাজুয়েট) সম্পন্ন করেন।

 

২০১২ সালে জেরীনের মা ও ২০১৪ সালে বাবা মারা যান। তারা দুজনেই জেরীনের সাফল্য দেখে গেছেন।

 বৃহত্তর ঢাকা জন্টা ক্লাব থেকে দুঃস্থ নারীদের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে

বৃহত্তর ঢাকা জন্টা ক্লাব থেকে দুঃস্থ নারীদের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে

 

‘বাবা-মায়ের খুব আদুরে সন্তান আমি। বাবার ইচ্ছায় ডাক্তার হয়েছি, তাতে আমার প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তিই বেশি হয়েছে। এটি ভেবে ভালো লাগে যে, বাবা-মায়ের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের পাশে থাকতে পেরেছি। ভীষণ মিস করি বাবা-মাকে।’

 

ডা. জেরীনের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে ওয়াজদান ফাইয়াজ মাহবুব। যুক্তরাষ্ট্রের বেইটস কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। মেয়ে সামানী জায়ীনা মাহবুব। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। দুজনেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

 বারিধারায় নিজ বাসায় ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

বারিধারায় নিজ বাসায় ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন। ছবি: নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

জেরীন দিলাওয়ার হোসেনের স্বামী ইফতেখার করিম। তিনি পেশায় প্রথমে ব্যাংকার ও পরে রাষ্ট্রদূত (ব্রুনাই) ছিলেন। বর্তমানে তিনি দেশে ও বিদেশে একজন সফল স্বতন্ত্র বিনিয়োগকারী। ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পরিচালক (স্বতন্ত্র) তিনি।

 

ডা. জেরীন দিলাওয়ার হোসেন ২০১৬ সালে উইংস সম্মাননা ও ২০১৮ সালে বৃহত্তর ঢাকা জন্টা ক্লাব থেকে সম্মাননা পুরস্কার পেয়েছেন।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত