বৃহস্পতিবার । অক্টোবর ২৪, ২০১৯ । । ০৮:৫৫ এএম

বিদ্বানের ভণ্ডামি, চেরি-পিক দৃশ্য ও আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

সৈনূই জুয়েল | নতুনআলো টোয়েন্টিফোর ডটকম
প্রকাশিত: 2016-11-03 20:01:49 BdST হালনাগাদ: 2016-11-03 20:30:31 BdST

Share on

সৈনূই জুয়েল

দৃশ্য- ১:  গরুর মাংস কিনতে গিয়েছেন। দেখলেন কসাই চাপাতি দিয়ে জবাইকৃত গরুর আস্ত একটা রান থেকে মাংসের অংশবিশেষ কেটে নিয়ে আপনাকে দিচ্ছেন। সেই অংশকে আরও ছোট ছোট টুকরো করে আপনাকে দিলেন। আপনি তা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

এটি একটি অভ্যস্ত হওয়া চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু এই দৃশ্যটিতে অভ্যস্ত নয় এমন মানুষ অতি সামান্য কিংবা নগন্য পরিমাণে থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

এই দৃশ্যের চেরি-পিক সংযোজন (বেছে বেছে ছবি, ভিডিও কিংবা লেখার অংশবিশেষ নিয়ে জোড়াতালি দেয়া উপকরণ) করে আপনি বিভ্রান্তি ছড়াতে পারেন। দুই বা ততোধিক পক্ষের মাঝে বিদ্বেষ জন্মাতে পারেন। এটি আপনি সহজেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে করতে পারেন। আর আমি সোশ্যাল মিডিয়াকে এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) বা বহুস্তর বিপণন প্রক্রিয়ার চেয়ে আগ্রাসী প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই দেখি। কেননা এমএলএম প্রক্রিয়ায় দুই হাত না হলে এগোয় না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এক হাত হলেই দৌড়ায়।

দৃশ্য- ২:  এবার গুরুটির পরিবর্তে যদি ওই রানটি হয় একজন মৃত মানুষের। আরেক জন জীবিত মানুষ সেটিকে চাপাতি দিয়ে কেটে, কুপিয়ে টুকরো টুকরো করছে। সেই টুকরোগুলোকে খোলা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে। তাও আবার শকুন কিংবা শুকরের জন্য।

এটি মোটেও একটি অভ্যস্ত হওয়া চিরচেনা দৃশ্য নয়। তাই আমরা ওই জীবিত মানুষটিকে কিংবা তার কাজটিকে অথবা উভয়কে ভয়াবহ, অসভ্য, বর্বর বলতেই পারি। কিন্তু এই দৃশ্যটিতে অভ্যস্ত এমন মানুষ অতি সামান্য কিংবা নগন্য পরিমাণে থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়।

এই দৃশ্যটি চীনের তিব্বত, কিনগাহি, সিচুয়ান, মঙ্গোলিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের মাঝে অধিক দেখা যায়। ভুটান, নেপাল এবং ভারতের সিকিম ও জংস্কর অঞ্চলেও এমন দৃশ্যের দেখা মেলে। মৃত মানুষের শরীরকে টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শকুন দিয়ে খাওয়ানোর চিত্রটি তাদের মৃতদেহ সৎকার প্রক্রিয়া। মৃতদেহ সৎকারের এই পদ্ধতির নাম স্কাই ব্যারিয়েল (sky burial) বা বাংলায় বলা যেতে পারে গগন সমাধি।  তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনুযায়ী তারা মানুষ মারা গেলে এই কাজটি করে।

অতি অপরিচিত এই দৃশ্যে আমরা কষ্ট বা ভয় পেতে পারি, অস্থির কিংবা বিষাদগ্রস্তও হতে পারি আবার নিন্দাও করতে পারি। কিন্তু এই দৃশ্যের ভিডিও দেখিয়ে আপনি জেনে-বুঝে যদি মানুষকে উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্ত করেন, জাতিতে-জাতিতে,ধর্মে-ধর্মে বিদ্বেষ সৃষ্টি করেন সেটি কি আরও বেশি আতংকের, ঘৃণার নয়?

ফেইসবুকে এমডি আব্দুর রহিম নামে এক ব্যক্তি এমন দৃশ্যের ২ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও তার ওয়ালে পোস্ট করেছে সম্প্রতি (২৯ অক্টোবর ২০১৬)।  ভিডিওটির সঙ্গে তিনি স্ট্যাটাস দিয়েছেনঃ

‘বার্মার বৌদ্ধ মালাউনরা মুসলমানদের কে কেটে টুকরো টুকরো করে সকুন কে খাওআচ্ছে । দুনিয়ার দালাল মিডিয়া গুলি এই খবর দেখাবে না তাই ভিডিওটা সর্বোচ্চ শেয়ার করে দুনিয়ার মানুষ কে দেখিয়ে দিন’

ওই ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার বার। এতে লাইক পড়েছে ১ হাজার। ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে ১০ হাজার ৯৭১ বার। কিন্তু কমেন্ট দেখা গেছে মাত্র একটি। এত ভিউ, লাইক, শেয়ারের সঙ্গে একটি মাত্র কমেন্ট- খুবই বিদঘুটে ব্যাপার। এই একটি জায়গায় বেশ খটকা লাগে। ওই ব্যক্তি কমেন্ট করার সুযোগ বন্ধ রেখেছেন।

অথচ ওই ভিডিওটির সঙ্গে স্ট্যাটাসের কোন সম্পর্ক নেই। ভিডিওটির সঙ্গে দেয়া স্ট্যাটাসে চরম মিথ্যাচার করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন মিথ্যাচার অহরহ চলছে। কিন্তু এসব মিথ্যাচারে অনেক মানুষ সহজেই প্রভাবিত হচ্ছেন।

তিব্বতের বৌদ্ধদের ওই স্কাই ব্যারিয়েল তথা মৃতদেহ কেটে টুকরো করে ছিটিয়ে শকুনদের খাওয়ানো মাধ্যমে সৎকার প্রক্রিয়া নিয়ে ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই একটি ফিচার প্রতিবেদন করে যুক্তরাজ্যের ডেইলিমেইল। পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে সংবাদটির শিরোনাম ছিলঃ

চপ্ড আপ এন্ড ফেড টু দ্য ভালচার্স, আ হান্টিং গ্লিম্পস ইনটু দ্য ক্লোজলি-গার্ডেড ট্র্যাডিশন অব দ্য টিবেটান স্কাই ব্যারিয়েল

গত বছরের ৩ নভেম্বর ডেইলি মেইল এ বিষয়ক আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিলঃ

দ্য টিবেটান ‘স্কাই ব্যারিয়েল’ হয়্যার বডিজ আর চপ্ড আপ এন্ড লেফট টু বি পিক্ড ক্লিন বাই ভালচার্স ‘হু টেইক দ্য ডেড টু হ্যাভেন’

দৃশ্য- ৩: একজন মানুষ মারা গেছেন। তার নিকটজনেরা কান্নাকাটি করছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে, মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে আপনজনেরা শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। এপর্যন্ত দৃশ্যটি অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু যখন আপনি দেখলেন, কয়েকদিন পেরিয়ে গেছে ওই মৃতব্যক্তিকে আপনজনদের সামনে বসা কিংবা শায়িত অবস্থায় রাখা হয়েছে। আর যদি মাস কিংবা বছর পার হয়ে যায় তাহলে দৃশ্যটি সহনীয় অস্বাভাবিকতাকেও ছাড়িয়ে অতিমাত্রায় গুরুতর অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আমরা এমন দৃশ্য হয়ত ভুল করেও কল্পনা করার সাহস করিনা।

অথচ এমন দৃশ্যেও অভ্যস্ত মানুষ সংখ্যায় অতি সামান্য কিংবা নগন্য হলেও আছে। এমন দৃশ্য মিলবে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের টোরাজান জাতির মানুষদের মাঝে। এটি সেখানকার ধর্মীয় ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি। আপনার আমার অস্বাভাবিক অনুভূতি দিয়ে তাদের কিছু যায় আসেনা। আপনার আমার মন খারাপ হতে পারে, আমরা কেউ কেউ কষ্ট পেতে পারি।

কিন্তু আমরা ক্ষিপ্ত হতে পারিনা। আমরা অবোধ-সুবোধ-নাতিবোধদের ভুল তথ্য দিয়ে খেপিয়ে তোলার ইন্ধন যোগাতে পারিনা। মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারিনা।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত