মঙ্গলবার । আগস্ট ২০, ২০১৯ । । ১০:২৩ এএম

রোহিঙ্গা সংকটের শেকড় অনুসন্ধান: একটি নির্মোহ তথ্য উপস্থাপনা

আরিফ ইননাস চনচল
প্রকাশিত: 2017-09-10 19:51:52 BdST হালনাগাদ: 2017-09-11 16:18:43 BdST

Share on

আরিফ ইননাস চনচল

বর্তমান বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী মায়ানমারে স্বীকৃত ১৩৫টি ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার মধ্যে 'রোহিঙ্গা' বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। রাখাইন রাজ্যে তো নয়ই। রোহিঙ্গা শব্দটির ব্যবহারেও এখন তাদের মারাত্মক অনীহা। এ নিয়ে তারা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবাদ পর্যন্ত করেছে।

অষ্টম শতকে আরাকান (রাখাইন) উপকুলে আরবীয় অথবা পারসিক জাহাজডুবির ফলে এ অঞ্চলে মুসলমানদের প্রথম আবির্ভাব ঘটে বলে জানা যায়। নবম থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত বাংলার সংস্পর্শে এর আরো বিস্তার ঘটে।

১৭৮৪ সালে বৌদ্ধ রাজা বোদাওপায়া (Bodawpaya) আরাকান দখল করে নিলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অধিকাংশ বাংলায় পালিয়ে যায়।

১৭৯০ সালে ব্রিটিশ কুটনীতিবিদ হিরাম কক্স এই শরণার্থী রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্যে একটি শহর বানিয়ে দেন, পরবর্তীতে যার নাম হয়ে যায় কক্সবাজার।

১৮২৪ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনামলে আবার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাস স্বাভাবিক হয়ে আসে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে বৌদ্ধ জাত্যাভিমানী জাপানীরা আরাকানসহ বার্মা দখল করে আবার রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেয় যারা তখন স্বায়ত্ত্বশাসনের আশায় ব্রিটিশদের পক্ষে লড়াই করছিল।

১৯৪৫ সালে রোহিঙ্গাদের আরাকানের স্বায়ত্ত্বশাসন লাভের মোহভঙ্গ হয়।

১৯৪৮ সালে তারা আরাকানকে মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার আন্দোলন শুরু করলে বার্মার আমলাতন্ত্র থেকে সকল রোহিঙ্গাদের চাকুরিচ্যুত করা হয়।

১৯৫০ সালে জঙ্গী মুজাহিদ আন্দোলন শুরু হলে সেটাও দ্রুত দমন করা হয়।

১৯৬২ সালে নে উইনের সমাজতান্ত্রিক শাসনামলে রোহিঙ্গাদের এই আন্দোলন আরো থিতু হয়ে আসে।

১৯৭৭ সালে 'ড্রাগন রাজা' খ্যাত নাগামিন রোহিঙ্গাদের উপর কঠোর দমন অভিযান পরিচালনা করলে দুই লক্ষ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে সংকটটি বর্তমানের ব্যাপক বিস্তৃত রূপ পরিগ্রহ করে।

১৯৭৮ সালে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগ বার্মায় ফিরে যায়।

১৯৮২ সালে বর্মী আইনে ১৮২৩ সাল পর্যন্ত বার্মার অধিবাসীদের ছাড়া ব্রিটিশ শাসনামলে আসা আরো বিশেষ করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আগত অভিবাসীদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়।

১৯৮৯ সালে বার্মা হয়ে যায় মায়ানমার।

১৯৯১ সালে রাখাইন রাজ্যে শৃঙখলা ফিরিয়ে আনার নামে অভিযান শুরু হলে ২ লক্ষ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে আরেকটি চুক্তির মাধ্যমে ২ লক্ষ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা আবার আরাকানে ফিরে যায়।

২০১২ সালে রোহিঙ্গা এবংরাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যেকার দাঙ্গায় শতাধিক মারা গেলে ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এবং ১ লক্ষ ৫০ হাজার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের দেয়া তথ্যানুসারে, এসময় স্বাধীন গণতান্ত্রিক - ভিন্নমতে ইসলামী - রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত মক্কায় বেড়ে উঠা আতা উল্লাহর নেতৃত্বে রোহিঙ্গা জঙ্গী সংগঠন 'হারাকাহ আল-ইয়াক্বিন' (বিশ্বাসের আন্দোলন/যুদ্ধ), যার বর্তমান নাম আরসা (ARSA বা আরাকান রোহিঙ্গা মুক্তি বাহিনী) গঠিত হয়। বর্তমানে এদের আনুমানিক সদস্যসংখ্যা ৫০০।

২০১৬ সালের অক্টোবরে আরাকানে মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকটি অবস্থানের উপর প্রথমবারের মতো হামলা চালায় আরসা। এই হামলায় ৯ জন সেনা কর্মকর্তাসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পালটা আক্রমণ এবং অভিযানের ফলে অন্তত ৬৯ জন জঙ্গী নিহত হয় এবং আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

সর্বশেষ, আজকের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি বা সংকট যে নামেই আমরা একে অভিহিত করি, তা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে মায়ামারের নিরাপত্তা বাহিনীর উপর দ্বিতীয় দফা আরসা কর্তৃক হামলার নিশ্চিত ফলাফল।

সংকলনের তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইম ইনকর্পোরেটেড ও গুগল অনুসন্ধানঃ রোহিঙ্গা পুশ ইন হিস্ট্রি

আরিফ ইননাস চনচল, বাংলা অনুবাদক, গ্লোবাল ভয়েসেস অনলাইন; প্রাক্তন উপসম্পাদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফর ডটকম।



  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত